স্ক্যাবিস বাংলাদেশে একটি মহামারী আকার ধারণ করেছে — এর কারণ, জটিলতা ও হোমিওপ্যাথিতে সঠিক চিকিৎসা

Dr. Md. Anas Sarkar
By -
0


বর্তমানে বাংলাদেশ এবং বিশ্বের অনেক অঞ্চলে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে, ভয়াবহ ত্বকের রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে— সেটি হলো স্ক্যাবিস (Scabies)।

এটি সাধারণত খোসপাঁচড়া নামে পরিচিত, কিন্তু এখন এই রোগের প্রকোপ এতটাই বেড়েছে যে, অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে “ত্বকের মহামারী” আখ্যা দিচ্ছেন।


স্কুলগামী শিশু, আবাসিক শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, গার্মেন্টস কর্মী এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যেও এই রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।

একজন আক্রান্ত ব্যক্তি যদি পরিবারের মধ্যে থাকেন, তবে কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো পরিবার আক্রান্ত হয়ে যায়।

সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে স্ক্যাবিস রোগীর সংখ্যা গত কয়েক মাসে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।


এই অবস্থায় মানুষের মধ্যে প্রয়োজন সঠিক সচেতনতা, প্রতিরোধ ব্যবস্থা, এবং বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা।


বিশেষ করে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় স্ক্যাবিসের ক্ষেত্রে এমন কিছু নির্বরযোগ্য থেরাপি আছে যা কেবল বাহ্যিক উপসর্গ নয়, বরং রোগকে  ভিতর থেকে সমূলে ধ্বংস করে।  

যেভাবে করোনা মহামারীর সময় হোমিওপ্যাথি মানবতার এক নতুন আশার আলো দেখিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই — কিংবা বলা যায়, হোমিওপ্যাথি তার থেকেও বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে স্ক্যাবিস নামক এই জটিল চর্মরোগের চিকিৎসায়।


করোনার কঠিন সময়ে যখন মানুষ হতাশ ও ভীত ছিল, তখন হোমিওপ্যাথি তার নিরাপদ, প্রাকৃতিক ও পার্সোনালাইজড চিকিৎসার মাধ্যমে অসংখ্য রোগীর আস্থা অর্জন করেছিল। আজ সেই একই ভরসা নিয়ে আমরা বলতে পারি —স্ক্যাবিসের ক্ষেত্রেও হোমিওপ্যাথি নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি।


যারা এই রোগে ভুগছেন বা পরিবারের কেউ আক্রান্ত, তারা নিশ্চিন্তে হোমিওপ্যাথির শরণাপন্ন হতে পারেন। হোমিওপ্যাথি রোগের মূল কারণকে ভেতর থেকে দূর করে দেয়, যাতে পুনরায় সংক্রমণ না ঘটে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী।


স্ক্যাবিস

স্ক্যাবিস কী?


স্ক্যাবিস একটি ত্বকের সংক্রামক রোগ, যা হয় একটি অতি ক্ষুদ্র পরজীবী Sarcoptes scabiei var hominis নামের মাইটের কারণে হয়ে থাকে।

এই মাইট এত ছোট যে এটি খালি চোখে দেখা যায় না; শুধুমাত্র মাইক্রোস্কোপে দেখা সম্ভব।


এই পরজীবীটি মানুষের ত্বকের উপরিভাগে ঢুকে সেখানে সুড়ঙ্গ তৈরি করে এবং ডিম পাড়ে।

ডিম থেকে নতুন মাইট বের হয়ে আবার ত্বকের ভেতরে বাসা বাঁধে, ফলে তীব্র চুলকানি ও ত্বকে ফুসকুড়ি দেখা দেয়।


স্ক্যাবিস মূলত মানুষ থেকে মানুষে সংস্পর্শে ছড়ায়।

যখন একজন আক্রান্ত ব্যক্তি অন্য কারো সাথে ঘনিষ্ঠভাবে বসবাস করে বা কাপড়, বিছানা, তোয়ালে ইত্যাদি শেয়ার করে, তখন এই মাইট সহজেই এক শরীর থেকে অন্য শরীরে চলে যায়।




সংক্রমণের কারণ ও বিস্তার


স্ক্যাবিসের বিস্তারের মূল কারণ হলো সংস্পর্শ ও অপরিচ্ছন্নতা।

এটি ছড়ানোর কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো—

  • আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বকের সরাসরি সংস্পর্শে আসা
  • একই বিছানা, তোয়ালে, কাপড় ব্যবহার করা
  • পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে বাকি সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া
  • হোস্টেল, বোর্ডিং স্কুল, কারাগার বা ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে বসবাস

বিশেষ করে যারা দরিদ্র বা নিম্নআয়ের মানুষ, তাদের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা যায় কারণ তাদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা কঠিন হয়। তবে এখন শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীতেও এটা ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে।




রোগের লক্ষণ


স্ক্যাবিসের লক্ষণগুলি ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। সাধারণত সংক্রমণের ২–৬ সপ্তাহ পরে উপসর্গ দেখা দেয়।


স্ক্যাবিসের প্রধান লক্ষণগুলো হলো—

  • তীব্র চুলকানি, বিশেষ করে রাতে ঘুমের সময়
  • ত্বকে ছোট ছোট ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ
  • আঙুলের ফাঁকে, কব্জিতে, কোমরে, বগলে, যৌনাঙ্গে, নাভির আশেপাশে র‍্যাশ বা দাগ
  • শিশুদের ক্ষেত্রে মাথা, মুখ, হাতের তালু, পায়ের তলাতেও ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে
  • বারবার চুলকানোর ফলে ত্বক ঘা হয়ে যায় এবং দ্বিতীয় সংক্রমণ (secondary infection) তৈরি হয়
  • এই চুলকানি এমন মাত্রার হয় যে রোগীরা রাতে ঘুমাতে পারেন না এবং মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েন।



জটিলতা:


যদি স্ক্যাবিসের সঠিক চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে এটি গুরুতর ত্বক সংক্রমণ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জটিলতা তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে ঘা ও পুঁজ
  • ত্বকের প্রদাহ
  • নেফ্রাইটিস বা কিডনি জটিলতা (চুলকানির ইনফেকশন থেকে)জা
  • ত্বকের ভেতরে অসংখ্য মাইট জন্মে গিয়ে পুরু খোসা বা শুকনো আঁশের মতো ত্বক তৈরি করে। এটি স্ক্যাবিসের মারাত্মক রূপ, যেখানে ত্বকের উপর মোটা, শক্ত ক্রাস্ট বা স্কেল জমে যায় এবং চুলকানি অনেক বেশি হয়।

এই অবস্থায় রোগী শুধু নিজের জন্য নয়, বরং তার চারপাশের মানুষের জন্যও একটি সংক্রমণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।



হোমিওপ্যাথিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্ক্যাবিস


হোমিওপ্যাথিতে স্ক্যাবিসকে শুধু একটি ত্বকের রোগ হিসেবে দেখা হয় না।

বরং এটি শরীরের ভেতরের গভীর অসামঞ্জস্য বা মায়াজমেটিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, যা বাহ্যিকভাবে চুলকানি হিসেবে প্রকাশ পায়।

এই রোগ শরীরের ভেতরের সংবেদনশীলতা, দমনকৃত ত্বকের সমস্যার প্রতিফলন।

অর্থাৎ, শুধুমাত্র মলম বা বাহ্যিক ওষুধ দিয়ে চুলকানি বন্ধ করলে তা সাপ্রেশন হয়।

ফলে রোগটি ভেতরে প্রবেশ করে আরও গভীর অসুখ (যেমন একজিমা, হাঁপানি, রিউমাটিজম, মানসিক সমস্যা) তৈরি করতে পারে।



হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা:

অনেক রোগী আমাদেরকে ফোন দিয়ে বলে, ডাক্তার সাহেব ওষুধের নাম বলে দেন, অনেকেই ক্ষোভও প্রকাশ করেন যে, কেন তাৎক্ষণিকভাবে ঔষধের নাম বলা হলো না। মূলত হোমিওপ্যাথিতে চিকিৎসা হয় ইন্ডিভিজুয়ালাইজড প্রক্রিয়ায়
অর্থাৎ প্রতিটি রোগীর স্ক্যাবিস এক নয় — তার শরীরের প্রকৃতি, মানসিক অবস্থা, রোগের ইতিহাস ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে প্রেসক্রিপশন দিতে হয়।

 তাছাড়াও কেস টেকিং, ঔষধ নির্বাচন, ডোজ ও রিপিটেশন, সাপ্রেশন এড়ানো,  এ ব্যাপারগুলো যেরকম সময়সাপেক্ষ তেমনই জটিল।

সুতরাং একজন দক্ষ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা করলে এই রোগ সম্পূর্ণ সারানো সম্ভব।



প্রতিরোধ ও সচেতনতা

স্ক্যাবিস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা

  • প্রতিদিন শরীর পরিষ্কার রাখা
  • আক্রান্ত ব্যক্তির আলাদা কাপড় ও বিছানা ব্যবহার
  • কাপড়, চাদর, তোয়ালে গরম পানিতে ধুয়ে রোদে শুকানো
  • পরিবারের সকল সদস্যদের একসাথে চিকিৎসা করা
  • আক্রান্ত ব্যক্তিকে জনসমাগমে কম আসা
  • শিশুরা স্কুলে গেলে তাদের শিক্ষককে অবহিত করা

স্ক্যাবিসের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হলো লজ্জা ও অজ্ঞতা
অনেকেই চুলকানিকে তুচ্ছ মনে করে চিকিৎসা নেয় না, ফলে এটি ছড়িয়ে যায়।
তাই সামাজিক সচেতনতা ও স্বাস্থ্যশিক্ষা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।


স্ক্যাবিস এখন আর কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয় — এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট
বাংলাদেশে এর দ্রুত বিস্তারের পেছনে রয়েছে ঘনবসতি, পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং চিকিৎসা সম্পর্কে অজ্ঞতা।

অন্যদিকে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ, স্টেরয়েড যুক্ত মলম, লোশন দিয়ে বারবার সাপ্রেশন করার ফলে রোগটি ভেতরে গিয়ে আরও জটিল হচ্ছে।

সঠিক চিকিৎসা, সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে স্ক্যাবিসকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)