আজকের ব্যস্ত জীবনে অ্যালার্জি একটি খুব সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাঁচি, নাক বন্ধ, চোখে চুলকানি, ত্বকে র্যাশ—এসব লক্ষণ আমাদের জীবনের দৈনন্দিন সমস্যা তৈরি করে। কিন্তু কি এই অ্যালার্জি এবং কোন কোন জিনিস আমাদের শরীরে এই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে? সব কিছুই নির্ভর করে অ্যালার্জেনের উপর।
এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো—অ্যালার্জেন কী, শরীরে কিভাবে কাজ করে, সাধারণ অ্যালার্জেনের ধরন এবং কিভাবে আমরা এগুলো থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি।
১. অ্যালার্জেনের কী?
অ্যালার্জেন (Allergen) হলো সেই যেকোনো পদার্থ যা আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে অস্বাভাবিকভাবে প্রতিক্রিয়া করতে প্ররোচিত করে। সাধারণভাবে আমাদের শরীর যে কোনো বাইরের পদার্থের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা রাখে। কিন্তু অ্যালার্জেনের ক্ষেত্রে, শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে যায়, যা অ্যালার্জির লক্ষণ হিসেবে প্রকাশ পায়।
অর্থাৎ, অ্যালার্জেন হল সেই ‘উদ্দীপক’, যা আমাদের শরীরকে অত্যধিক প্রতিক্রিয়াশীল করে তোলে।
২. অ্যালার্জির ধরন
অ্যালার্জির লক্ষণ ও তীব্রতা ভিন্ন ধরনের অ্যালার্জেনের উপর নির্ভর করে। প্রধান ধরনের অ্যালার্জি হলো:
- রেসপিরেটরি অ্যালার্জি (Respiratory Allergy): নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি, নাক বন্ধ, শ্বাসকষ্ট। উদাহরণ: ধুলো, পোলেন, ফাঙ্গাল স্পোর।
- ডার্মাটোলজিক বা ত্বকের অ্যালার্জি (Skin Allergy): চুলকানি, র্যাশ, একজিমা। উদাহরণ: ল্যাটেক্স, রুক্ষ ত্বক, কিছু খাবারের প্রতি অ্যালার্জি।
- ফুড অ্যালার্জি (Food Allergy): খাবার খাওয়ার পর পেট ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি, মুখ ও গলা ফোলা। উদাহরণ: দুধ, ডিম, বাদাম, সয়াবিন।
- মেডিকেশন অ্যালার্জি (Drug Allergy): ঔষধ খাওয়ার পর চুলকানি, ফুসকুড়ি বা শ্বাসকষ্ট। উদাহরণ: পেনিসিলিন, অ্যামোক্সিসিলিন।
- ইনসেক্ট বাইট অ্যালার্জি (Insect Bite Allergy): পোকামাকড়ের কামড় বা হানি বিট, বী স্টিং। উদাহরণ: মৌমাছি, পিঁপড়ে, মশা।
৩. শরীরে অ্যালার্জেন কিভাবে কাজ করে?
অ্যালার্জির মূল কারণ হলো ইমিউন সিস্টেমের অতিসক্রিয়তা।
- শরীর যখন কোনো অ্যালার্জেনের সংস্পর্শে আসে, তখন ইমিউন সিস্টেম এটিকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে।
- ইমিউন সিস্টেম অ্যান্টিবডি তৈরি করে, বিশেষ করে IgE অ্যান্টিবডি।
- এই IgE অ্যান্টিবডি হিস্টামিন নামক রাসায়নিক নির্গত করে।
- হিস্টামিনের প্রভাবে দেখা দেয় হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া, চুলকানি, ফোলা ইত্যাদি।
অর্থাৎ, অ্যালার্জি মূলত শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা একপ্রকারের অতিসক্রিয়তার ফল।
৪. সাধারণ অ্যালার্জেনের ধরন
৪.১ ধুলো (Dust)
ঘরের ধুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ অ্যালার্জেন। ধুলোর মধ্যে থাকতে পারে ডাস্ট মাইট (Dust Mite), মৃত কোষের অংশ, পলিউশন।
- লক্ষণ: হাঁচি, নাক বন্ধ, চোখ লাল হওয়া, শ্বাসকষ্ট।
- প্রতিরোধ: ঘর নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, HEPA ফিল্টার ব্যবহার, ডাস্ট-মাইট কভার ব্যবহার।
৪.২ পোলেন (Pollen)
ফুল, গাছের পাতা থেকে বাতাসে ছড়ায়। বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে বেশি।
- লক্ষণ: হাঁচি, চোখ চুলকানি, নাক দিয়ে পানি পড়া।
- প্রতিরোধ: বাইরে বের হলে মাস্ক পরা, ঘরে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার, বাতাসে শুকনো কাপড় ঝুলানো এড়ানো।
৪.৩ খাদ্য (Food)
কিছু খাবারের সঙ্গে শরীর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখায়।
- সাধারণ অ্যালার্জেন: দুধ, ডিম, বাদাম, সয়াবিন, সামুদ্রিক খাবার।
- লক্ষণ: চুলকানি, ফোলা, বমি, ডায়রিয়া।
- প্রতিরোধ: পরিচিত অ্যালার্জেন এড়ানো, খাবার পরীক্ষা করে খাওয়া।
৪.৪ পশুর লোম বা স্কেল (Pet Dander)
কুকুর, বিড়াল বা অন্যান্য পোষা প্রাণীর লোমে থাকা মৃত কোষ।
- লক্ষণ: হাঁচি, চোখ লাল হওয়া, শ্বাসকষ্ট।
- প্রতিরোধ: ঘরে পশু রাখলে নিয়মিত গোসল ও লোম পরিষ্কার করা।
৪.৫ ছত্রাক ও ফাঙ্গাল স্পোর (Mold and Fungal Spores)
বাড়ির ভেজা জায়গা, সিলিং, বাথরুমে ফাঙ্গাল স্পোর থাকতে পারে।
- লক্ষণ: শ্বাসকষ্ট, হাঁচি, চোখ লাল হওয়া।
- প্রতিরোধ: ঘর শুকনো রাখা, ভেজা স্থানে পরিষ্কার রাখা, ভেন্টিলেশন ঠিক রাখা।
৪.৬ ঔষধ (Medications)
কিছু ঔষধ শরীরকে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখায়।
- সাধারণ: পেনিসিলিন, সেলফি (Sulfa) ঔষধ।
- লক্ষণ: ফুসকুড়ি, চুলকানি, শ্বাসকষ্ট।
- প্রতিরোধ: আগে চিকিৎসকের পরামর্শ, অ্যালার্জি টেস্ট করা।
৪.৭ পোকামাকড়ের কামড় (Insect Bites/Stings)
মৌমাছি, পিঁপড়ে, মশার কামড়ে শরীর অ্যালার্জিক হতে পারে।
- লক্ষণ: ফোলা, লাল দাগ, শ্বাসকষ্ট।
- প্রতিরোধ: পোশাক ঢেকে রাখা, পোকামাকড় দূরে রাখা।
৫. অ্যালার্জি নির্ণয় ও পরীক্ষা
অ্যালার্জি শনাক্ত করার জন্য বেশ কিছু পরীক্ষা আছে:
- স্কিন প্রিক টেস্ট (Skin Prick Test): অ্যালার্জেনের ছোট অংশ ত্বকে দেওয়া হয়। যদি লাল দাগ বা ফোলা আসে, অর্থাৎ অ্যালার্জি আছে।
- ব্লাড টেস্ট (Blood Test): IgE অ্যান্টিবডি মাপা হয়।
- ফুড চ্যালেঞ্জ (Food Challenge): বিশেষ খাবার ধীরে ধীরে খাওয়ানো হয় এবং প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়।
অ্যালার্জেন হল সেই বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ পদার্থ যা শরীরকে অতিসক্রিয় করে তোলে এবং অ্যালার্জির লক্ষণ তৈরি করে। ধুলো, পোলেন, পশু লোম, খাবার, ঔষধ, ফাঙ্গাল স্পোর এবং পোকামাকড়ের কামড় সবচেয়ে সাধারণ অ্যালার্জেন।
প্রতিরোধ ও সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ঘর পরিষ্কার, পরিচিত অ্যালার্জেন এড়ানো, শ্বাসনালী স্বাস্থ্য বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে অ্যালার্জির সমস্যা স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং রোগীর দৈনন্দিন জীবন স্বস্তিদায়ক করা যায়।

