আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা (immune system) মূলত তৈরি হয়েছে বাইরের জীবাণু, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা টক্সিনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা দেওয়ার জন্য। কিন্তু কখনও কখনও এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে এমন কিছু নিরীহ পদার্থকে “বিপজ্জনক শত্রু” হিসেবে শনাক্ত করে ফেলে—এই অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াকেই বলে এলার্জি (Allergy)।
এলার্জি কীভাবে তৈরি হয়—সহজভাবে বুঝুন
শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন কোনো নিরীহ বস্তু যেমন—ধুলো, পরাগরেণু, পশুর লোম, বা কিছু খাবারকে ক্ষতিকর মনে করে, তখন শরীর তৎক্ষণাৎ এক ধরনের বিশেষ অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যাকে বলে IgE (Immunoglobulin E)।
এই IgE অ্যান্টিবডি শরীরের কিছু বিশেষ কোষ—Mast Cell ও Basophil এর সাথে যুক্ত হয়ে থাকে।
পরবর্তীবার যখন ঐ একই অ্যালার্জেন শরীরে প্রবেশ করে, তখন এই IgE তৎক্ষণাৎ তা শনাক্ত করে এবং Mast Cell থেকে Histamine নামক রাসায়নিক নিঃসৃত হয়।
Histamine-ই হলো সেই মূল উপাদান যা—
- হাঁচি
- নাক দিয়ে পানি পড়া
- চোখ চুলকানো
- ত্বকে ফুসকুড়ি
- গলায় চুলকানি
- বা শ্বাসকষ্ট
—এসব উপসর্গ তৈরি করে।
ধাপে ধাপে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া (Allergic Reaction Steps)
১️ প্রথম সংস্পর্শ (Sensitization phase):
প্রথমবার অ্যালার্জেন শরীরে ঢোকার সময় শরীর সেটিকে “বিপদ সংকেত” মনে করে এবং IgE তৈরি করে।
২️ IgE সংযোগ:
এই IgE Mast Cell-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়—একে বলা হয় sensitized mast cell।
৩️ দ্বিতীয় সংস্পর্শ (Re-exposure):
দ্বিতীয়বার যখন সেই অ্যালার্জেন আবার শরীরে আসে, তখন IgE সেটিকে চিহ্নিত করে তৎক্ষণাৎ Histamine ছাড়ে।
৪️ প্রতিক্রিয়া (Allergic Response):
Histamine রক্তনালী প্রসারিত করে, শ্লেষ্মা বাড়ায়, এবং নাক, চোখ, গলা বা ত্বকে প্রদাহ সৃষ্টি করে—ফলেই দেখা যায় অ্যালার্জির দৃশ্যমান লক্ষণ।
এলার্জির সাধারণ ধরন
১. শ্বাসতন্ত্রের অ্যালার্জি:
- এলার্জিক রাইনাইটিস, অ্যাজমা, সাইনুসাইটিস ইত্যাদি
- একজিমা, আর্টিকারিয়া (চুলকানিযুক্ত দাগ), কনট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস
- দুধ, ডিম, বাদাম, সামুদ্রিক খাবার ইত্যাদি
- অ্যান্টিবায়োটিক, পেইনকিলার, ভ্যাকসিন ইত্যাদিতে প্রতিক্রিয়া
- মৌমাছি বা মশার কামড়ে ফুলে যাওয়া, লাল দাগ ইত্যাদি
বাংলাদেশে অ্যালার্জির কারণ
- ধুলোবালি ও রাস্তার ধোঁয়া
- শীতকালে কুয়াশা ও ঘন বাতাস
- গৃহস্থালির ধুলার মাইট (Dust mites)
- পুরনো বালিশ, ম্যাট্রেস ও পর্দা
- পশুপাখির লোম
- কিছু নির্দিষ্ট খাবার (চিংড়ি, ডিম, দুধ)
- পরিবেশ দূষণ ও ধোঁয়া
এলার্জি কতটা ক্ষতিকর হতে পারে
যদিও বেশিরভাগ অ্যালার্জি জীবনঘাতী নয়, তবুও কিছু ক্ষেত্রে এটি Anaphylaxis নামে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে—
যেখানে হঠাৎ শ্বাস নিতে কষ্ট, মাথা ঘোরা, রক্তচাপ কমে যাওয়া ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।
এই অবস্থা জীবননাশের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রয়োজন।
চিকিৎসা
Allopathic চিকিৎসায়:
সাধারণত antihistamine, nasal spray বা corticosteroid দেওয়া হয় উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। তবে এগুলো অস্থায়ী সমাধান।
হোমিওপ্যাথিতে: চিকিৎসা হয় রোগীর constitution ও sensitivity pattern অনুযায়ী।
হোমিওপ্যাথিতে লক্ষ্য থাকে শুধু উপসর্গ কমানো নয়, বরং প্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্য পুনঃস্থাপন করা—যাতে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে নিজে থেকেই বন্ধ হয়।
হোমিওপ্যাথির দৃষ্টিতে, অ্যালার্জি হলো শরীরের অভ্যন্তরীণ “হাইপার-রিঅ্যাকটিভিটি”—যেখানে ব্যক্তির সংবেদনশীলতা (Susceptibility) বেশি হওয়ায় সামান্য উত্তেজনাতেই উপসর্গ শুরু হয়।
চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো এই অতিরিক্ত সংবেদনশীলতাকে কমিয়ে শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
এ কারণেই হোমিওপ্যাথি অ্যালার্জির ক্ষেত্রে উপসর্গ কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী সমাধান দেয়।
এলার্জি হলো আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থার এক “অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া”—যেখানে নিরীহ পদার্থের বিরুদ্ধে শরীর নিজেই যুদ্ধ ঘোষণা করে।
এই যুদ্ধের ফলেই হয় হাঁচি, চুলকানি, নাক বন্ধ, বা ত্বকের প্রদাহ।
সঠিক রোগনির্ণয়, অ্যালার্জেন চিহ্নিতকরণ ও রোগীর প্রকৃতি অনুযায়ী চিকিৎসা—এই তিনটি ধাপই স্থায়ী সমাধানের মূল চাবিকাঠি।

