বাংলাদেশে শীতকাল এলেই বা মৌসুম পরিবর্তনের সাথে সাথে হাঁচি, নাক দিয়ে পানি ঝরা, চোখে চুলকানি—এসব সমস্যা যেন অনেকের নিত্যসঙ্গী। অনেকেই মনে করেন এটি সাধারণ ঠান্ডা, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর নেপথ্যে থাকে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস—একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু উপেক্ষিত দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা।
আমি ডা. আনাস সরকার, একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হিসেবে নিয়মিত এমন রোগীদের দেখি—যারা বহু বছর ধরে অ্যান্টিহিস্টামিন ও নাকের স্প্রে ব্যবহার করে ক্লান্ত, কিন্তু স্থায়ী সমাধান পাচ্ছেন না।
এই আর্টিকেলে জানুন—অ্যালার্জিক রাইনাইটিস আসলে কী, কেন হয়, শীতকালে কেন বাড়ে, কেন এটি স্থায়ীভাবে ভালো হয় না, এবং হোমিওপ্যাথিতে কীভাবে এর মূল কারণভিত্তিক স্থায়ী চিকিৎসা সম্ভব।
অ্যালার্জিক রাইনাইটিস কী?
অ্যালার্জিক রাইনাইটিস হলো নাকের ভিতরের মিউকোসাতে অ্যালার্জেনের সংস্পর্শে সৃষ্ট প্রদাহ। সাধারণভাবে এটি হে-ফিভার নামে পরিচিত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি সাধারণ ঠান্ডা নয়।
এই অসুখে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) নিরীহ কণাকে(এমন জিনিস যা স্বাভাবিকভাবে মানুষের শরীরের কোনও ক্ষতি করার কথা নয়) বিপজ্জনক মনে করে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়।
ফলাফল—
হাঁচি, নাক দিয়ে পানি ঝরা, চোখ-নাক চুলকানো, নাক বন্ধ হওয়া, মাথা ব্যথা ইত্যাদি দেখা দেয়।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০–৩০% মানুষ এ অসুখে ভোগে। বাংলাদেশেও এর হার দ্রুত বাড়ছে, এর বিশেষ করে—
- বায়ুদূষণ
- ধুলোবালি
- পোষা প্রাণী
- সিগারেট ধোঁয়া
- রাসায়নিক গন্ধ
- আবহাওয়ার পরিবর্তন
এর কারণে সমস্যাটি আরও বেড়ে যাচ্ছে।
অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের ধরন:
১. মৌসুমি অ্যালার্জিক রাইনাইটিস / Seasonal Allergic Rhinitis (SAR)
যারা পরাগ, আগাছা, ঘাস, নির্দিষ্ট গাছপালার কারণে অ্যালার্জি হয়ে থাকে—তাদের সাধারণত নির্দিষ্ট ঋতুতে সমস্যা বেড়ে যায়।
২. সারা-বছর-ব্যাপী অ্যালার্জিক রাইনাইটিস / Perennial Allergic Rhinitis (PAR)
এটি বছরের ১২ মাসই হতে পারে—কারণ
ডাস্ট মাইট (ধুলার ক্ষুদ্র পোকা), স্যাঁতসেঁতে ঘরের ছত্রাক, পশুর লোম, বালিশ–ঘরের কাপড়ের ফাইবার, পারফিউম/সুগন্ধি, কেমিক্যাল, রুম ফ্রেশনার, পুরোনো বাড়ির ধুলা ইত্যাদি জিনিস গুলোর প্রতি যাদের ইমিউন সিস্টেম অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায় তাদের সারা-বছর-ব্যাপী অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের সমস্যায় ভুগে থাকেন।
৩. পেশাগত অ্যালার্জিক রাইনাইটিস / Occupational Allergic Rhinitis (OAR)
যারা কর্মস্থলের পরিবেশে কিছু নির্দিষ্ট কেমিক্যাল বা ধুলার সংস্পর্শে আসে—তাদের এই ধরনের অ্যালার্জি হয়।
যেমন: (লন্ড্রি/গার্মেন্টস কর্মী, সিমেন্ট/টাইলস মিস্ত্রি, কাঠের কাজের কারিগর, বিউটি পার্লারের কর্মী, ল্যাবরেটরিতে রাসায়নিক নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি, কৃষক (ধান-গমের ধুলা) )
অ্যালার্জিক রাইনাইটিস কেন হয়?
অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের মূল কারণ হলো ইমিউন সিস্টেমের ভুল প্রতিক্রিয়া।
নিরীহ কণাকে (ধূলা, ডাস্ট মাইট, গাছের ফুল, ঘাস, গাছপালার পরাগ রেণু, বিড়াল/কুকুরের লোম, বাতাসে থাকা ছত্রাক বা ফাঙ্গাসের খুব ক্ষুদ্র কণা, তীব্র গন্ধ_যেমন:পারফিউম, স্প্রে, রুম ফ্রেশনার, সিগারেটের ধোঁয়া) শরীর “বিপদ” মনে করে। এতে শরীর Histamine, Leukotrienes ইত্যাদি রাসায়নিক নিঃসরণ করে।
ফলাফল—নাক ফুলে যায়, হাঁচি শুরু হয়, পানি পড়ে, চোখ লাল হয়, চুলকায়।
অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের প্রধান লক্ষণ:
✔ প্রাথমিক লক্ষণ
- একের পর এক হাঁচি
- নাক দিয়ে পরিষ্কার পানি পড়া
- নাক-চোখ-কান চুলকানো
- চোখ লাল হওয়া ও পানি পড়া
- গলার ভেতরে চুলকানি
✔ দীর্ঘস্থায়ী বা জটিল লক্ষণ
- নাক বন্ধ
- মাথা ভারী লাগা
- গলার পিছন দিয়ে মিউকাস নামা (Post Nasal Drip)
- কাশির প্রবণতা
- কান বন্ধ লাগা বা শব্দ হওয়া
- চোখের নিচে কালো দাগ (Allergic Shiners)
কিন্তু প্রশ্ন হলো— স্থায়ী চিকিৎসা হচ্ছে না কেন?
কারণ অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় যে ওষুধগুলো দেওয়া হয়— অ্যান্টিহিস্টামিন, নাকের স্টেরয়েড স্প্রে
এসব ওষুধ শুধুই উপসর্গকে চেপে রাখে, কিন্তু ইমিউন সিস্টেমের ভুল প্রতিক্রিয়া ঠিক করে না।
যে কারণে—ওষুধ বন্ধ করলেই সমস্যা ফিরে আসে
দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
রোগী মাসের পর মাস, বছরের পর বছর একই চক্রে ঘুরতে থাকে
এখানেই প্রয়োজন রোগের মূল কারণভিত্তিক চিকিৎসা।
হোমিওপ্যাথি কেন অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের স্থায়ী সমাধান?
হোমিওপ্যাথি অ্যালার্জিক রাইনাইটিসকে Root Cause থেকে চিকিৎসা করে। এটি শুধু হাঁচি থামানো বা নাক বন্ধ খুলে দেওয়ার ওষুধ নয়।
অ্যালার্জিতে ইমিউন সিস্টেম অতি সক্রিয় হয়ে যায়। হোমিওপ্যাথি এই অতিসংবেদনশীলতা কমিয়ে শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।
ফল— শরীর ধূলা, ডাস্ট মাইট, গাছের ফুল, ঘাস, গাছপালার পরাগ রেণু, বিড়াল/কুকুরের লোম, বাতাসে থাকা ছত্রাক বা ফাঙ্গাসের খুব ক্ষুদ্র কণা, তীব্র গন্ধ_যেমন:পারফিউম, স্প্রে, রুম ফ্রেশনার, প্রতি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া করা বন্ধ করে দেয়।
