টনসিলাইটিস (Tonsilitis) কারণ, লক্ষণ, টনসিলাইটিস এর জটিলতা!

Dr. Md. Anas Sarkar
By -
0

জিহ্বার গোড়ার দিকে আলজিভ থাকে (Uvula) এবং এই আলজিভের দুই পাশের স্থানকে টনসিল বলে। টনসিল এক ধরনের লসিকাগ্রন্থি বা লিম্ফয়েড টিস্যু। এতে কোনো ধরনের ইনফেকশন বা প্রদাহ হলে আমরা এটাকে টনসিলাইটিস (Tonsilitis) বলি।

প্রথমত লক্ষণানুসারে টনসিলাইটিস দুই প্রকারের হতে পারে যথা:-

  1. তরুণ (acute)
  2. পুরাতন (chronic)

তরুণ (acute) টনসিলাইটিসের লক্ষণগুলো

  • দুই পাশের টনসিল অথবা একদিকের একটি টনসিল স্ফীত হয় এবং বড় হতে হতে প্রায় সুপারীর মত আকার ধারণ করে।
  • আলজিভটি ফুলে যায় এবং লাল বর্ণের হয়।
  • আহার এবং পানীয় গ্রহণের পথ প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে যায়।
  • মুখ দিয়ে লালা ঝরে, টনসিলের ব্যথায় কান পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়।
  • জ্বর হয়, জ্বরের তাপমাত্রা প্রায় ১০৩ – ১০৪° পর্যন্ত উঠে।
  • মুখের চোয়ালে ব্যথা হয়, গলা ফুলে যায়, হা করতে পারে না।
  • খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের পথ (pharynx) সংকুচিত হয়ে আসে।
  • টনসিল অনেক সময় পাকে এবং ফেটে যায়, পাকার আগে ভীষণ যন্ত্রণা হয়, টনসিল ফেটে গেলে যন্ত্রণার উপশম হয়।

পুরাতন (chronic) টনসিলাইটিসের লক্ষণগুলো

  • রোগী বার বার এই রোগে (টনসিলাইটিস) আক্রান্ত হয়।
  • টনসিলের পুনঃ পুনঃ প্রদাহ হইবার ফলে টনসিলের গঠন স্থায়ী ভাবে বৃদ্ধি (chronic parenchymatous tonsillitis) হয়।
  • হা করলে মুখের ভিতরে টনসিলটিকে একটি বড় সুপারীর মত দেখায়।
  • টনসিল লাল, ফোলা এবং বড় হতে থাকে। টনসিলাইটিস এর পৃষ্ঠে সাদা বা হলুদ আঠাল পুঁজপূর্ণ ছিদ্র দেখা যাবে।
  • এই রোগ পুরাতন হলে রোগীর শ্বাস প্রশ্বাসে কষ্ট দেখা দেয় এবং এক প্রকার শব্দ হয়।
  • দীর্ঘস্থায়ী বা chronic টনসিলাইটিসের টনসিলে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কারণে ক্রমাগত নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ হতে পারে।
  • বর্ধিত বা স্ফীত টনসিলের কারণে গিলতে অসুবিধা, অস্বস্তিকর বা বেদনাদায়ক করে তুলতে পারে, বিশেষ করে শক্ত খাবার খাওয়ার সময়।
  • দীর্ঘস্থায়ী বা chronic টনসিলাইটিসের ব্যথা কানে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যার ফলে কানে ব্যথা অনুভূতি হয়।
  • ক্রনিক টনসিলাইটিসের কারণে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ এবং অস্বস্তি সাধারণ ক্লান্তি এবং শারীরিক ভাবে দুর্বল করে তুলেতে পারে।

রোগের অবস্থানুসারে টনসিলাইটিসকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

  1. ক্যাটারাল (catarrhal tonsillitis)
  2. ফলিকিউলার (Follicular tonsillitis)
  3. সাপুরেটিভ (Suppurative tonsillitis)

ক্যাটারাল অবস্থায় টনসিলের স্ফীত ভাব এবং সামান্য প্রদাহের সৃষ্টি হয়।

ফলিকিউলার টনসিলাইটিস অবস্থায় আলজিভের কাছে পোস্ত দানার ন্যায় এক প্রকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানার মত ঘা থাকে, এই দানার মত ঘা গুলোকে ফলিকলস বলে। যখন এই দানার মত গ্ল্যান্ড গুলো আক্রান্ত হয় তখন ইহাকে ফলিকিউলার টনসিলাইটিস বলে।

গ্ল্যান্ডের প্যারেনকাইমা আক্রান্ত হয় এবং স্ফীত হয়ে প্রদাহ ভাবের সৃষ্টি করে এবং পুঁজের উৎপত্তি হয় তখন ইহাকে সাপুরেটিভ বা কুইসি বলা হয়।

এই রোগের সূচনা দেখে বলা যায় না যে এই রোগটি কোন শ্রেণীর হবে অথবা কেমন অবস্থার সৃষ্টি করবে । এই রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য থাকায় ইহাকে শ্রেণীভাগ করা বেশ কঠিন। রোগীর রোগ লক্ষণ দেখে ইহাকে শ্রেণীভাগ করা বেশ কঠিন। সম্প্রতি ইউরোপ এবং আমেরিকার খ্যাতনামা চিকিৎসকগণ মনে করেন যে রোগ শূন্য টনসিল স্বাস্থ্যের পক্ষে বিশেষ উপকারী কারণ শক্তিশালী টনসিল অনেক সময় শরীরে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশে বাধা দেয়। কিন্তু রোগাক্রান্ত টনসিল বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি পথে সাহায্য করে। অতএব টনসিল যাতে রোগাক্রান্ত না হয় সেই দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। কারণ "Diseased Tonsils Serve as the Port of entry for such bacteria. So Tonsils should be kept in good Condition."

সাধারণত ঠাণ্ডা লেগে এই রোগ হয়ে থাকে।

এছাড়া ঋতু পরিবর্তন, রক্তাধিক্য এবং স্ক্রুফুলা ধাতুর ব্যক্তি গণের ঘাম হবার সময় হঠাৎ ঠাণ্ডা লেগে সেই ঘাম বন্ধ হয়ে এই রোগের সৃষ্টি করতে পারে।

শরীরের অন্যান্য স্থানের প্রদাহ যে কারণে হয় টনসিলের প্রদাহও ঠিক একই কারণে হয়।

টনসিলাইটিসের জন্য কোন বিশেষ প্রকার জীবাণু আছে বলে এখনো জানা যায় নাই। তবে যতদূর পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে তাতে দেখা যে staphylo cocci, streptococci এবং pneumococci প্রভৃতি জীবাণুর সন্ধান এই রোগের ক্ষেত্রে পাওয়া যায়।

    ✅সাধারণত দেখা যায় এই রোগটি আক্রমণের সূচনা হতে প্রায় ১ থেকে চার সপ্তাহকাল পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হয় অর্থাৎ রোগীর ভোগান্তি কাল প্রায় সাত থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত। তবে ১০/১৫ দিনের মধ্যে ইহার যাবতীয় লক্ষণগুলো প্রকাশ লাভ করে।
    ✅ইহার প্রথম লক্ষণ প্রকাশ পায় গলা ব্যথার মাধ্যমে তারপর আনুসংগিক উপসর্গগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে যেমন মাথার যন্ত্রণা, পিঠে ব্যথা, দুর্বলতা, শরীরের নানা স্থানে ব্যথা, মুখমণ্ডল স্ফীত এবং রক্তিমবর্ণ ধারণ করে।
    ✅যাবতীয় লক্ষণগুলোই অতি দ্রুত প্রকাশ পেতে থকে। জ্বর হয়; অন্যান্য লক্ষণের সংগে জ্বর, শীত শীত ভাব বর্তমান থাকে, জ্বরের তাপমাত্রা সাধারণত ১০১ হতে ১০৪ পর্যন্ত উঠে, জ্বরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা তৃতীয় দিনের সন্ধ্যার সময় উঠে।
    ✅জিহ্বায় ময়লার প্রলেপ, জিহ্বা শুকনো, মুখ থেকে প্রচুর লালা নিসৃত হয়।
    ✅টনসিল দুটি অথবা একটি স্ফীত হয়ে রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। এই স্ফীত এবং রক্তিম ভাব মুখের বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। গলায় ব্যথা এবং প্রদাহ ভাব দেখা দেয়।
    ✅রোগী হাঁ করতে পারে না এমন কি কথা বলতে কষ্ট বোধ করে।
    ✅টনসিলাইটিস অনেক সময় স্বরযন্ত্রের উপর খারাপ প্রভাব বিস্তার করে, রোগীর স্বরভংগ ভাব দেখা দেয় এবং নাকি সুরে কথা বলে।

টনসিলাইটিসের ভাবীফল অনেক ক্ষেত্রেই মারাত্মক আকার ধারণ করে থাকে। তবে সাধারণভাবে এই রোগ নির্ণয় করা সহজ, অনেক সময় খাদ্যনালী আক্রান্ত হয়ে রোগীর অবস্থা খুব সংকটময় করে তোলে আবার অনেক সময় আরক্ত জ্বর (Scarlet) দেখা দেয়।

আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে ফলিকিউলার টনসিলাইটিস ডিপথিরিয়া রোগের সৃষ্টি করে। ফলিকিউলার টনসিলাইটিস এবং ডিপথিরিয়ার লক্ষণগুলো প্রায় সমান এবং যথেষ্ট সাদৃশ্যযুক্ত তাই চিকিৎসকগণ অনেক সময় সঠিকভাবে রোগীর রোগ নির্ণয় করতে পারেন না। অর্থাৎ রোগী ফলিকিউলার টনসিলাইটিসে আক্রান্ত অথবা ডিপথিরিয়ায় আক্রান্ত এ নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।

সাপুরেটিপ টনসিলাইটিস অনেক সময় খাদ্য নালীতে ফোঁড়া সৃষ্টি করে এমন ভয়ংকর রূপ লাভ করে যে ইহাতে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই রোগে রোগীর মৃত্যু সংখ্যা তেমন যথেষ্ট নয়। লক্ষণানুসারে উপযুক্ত চিকিৎসায় টনসিলাইটিস আরোগ্য হয়ে থাকে ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)