ডেংগু এক প্রকার বহু ব্যাপক অল্পদিন স্থায়ী জ্বর বিশেষ। এই জ্বরকে Break bone fever বা হাড় ভাংগা জ্বর নামেও অভিহিত করা হয়।
এই জ্বর হলে শরীরে এক প্রকার হামের ন্যায় উদ্ভেদ প্রকাশ পায়। মাথায় যন্ত্রণাদায়ক ব্যথার সৃষ্টি হয়, সর্বাঙ্গে এবং গ্রন্থিতে ভীষণ ব্যথার সৃষ্টি হয়, এই রোগ যদিও ৩/৪ দিন থাকে অর্থাৎ স্বল্পকাল স্থায়ী হলেও ইহাতে গাঁ, হাত, পা সর্বাঙ্গের ব্যথা এবং মাথার যন্ত্রণা এত বেশী হয় যে রোগী অত্যন্ত দুর্বল এবং কাতর হয়ে পড়ে।
ডেঙ্গু রোগের কারণ Aedes aegypti and Aedes albopictus এক জাতীয় স্ত্রী মশা এই জীবাণু বহন করে। এই মশা কামড়ালে ডেংগু রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে। এই জাতীয় মশাই একজনের পীড়িত দেহ হতে অন্যজনের দেহে রোগ জীবাণুর সঞ্চার করে থাকে।
এই রোগ সব দেশেই এবং সব বাড়িতেই হতে পারে। গ্রীষ্ম-প্রধান দেশ যেমন- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, ল্যাটিন আমেরিকা এবং আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যায়। ভারত, বাংলাদেশ প্রধানত এই রোগ গ্রীষ্ম এবং বর্ষা সময় রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।
১৮৭২ সালে এবং ১৯১১ সালে এই রোগ ভারত এবং বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকরূপে প্রকাশ পেয়েছিল । ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অংশেও এর প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে ।
ডেঙ্গুর লক্ষণ _ সর্বাঙ্গে বিশেষ করে সন্ধিগুলোতে তীব্র ব্যথা এবং সামান্য শীত সহ এই জ্বর হঠাৎ আরম্ভ হয় । ধীরে ধীরে মাথার বেদনাদায়ক যন্ত্রণা শুরু হয়, কখনো বমি, কম্পন, পরে অত্যধিক গায়ে তাপমাত্রা। জ্বরের তাপমাত্রা ১০২°–১০৬° পর্যন্ত হতে পারে।
এই জ্বর আসার পর সর্বাঙ্গে কামড়ানো ব্যথার সৃষ্টি হয়। কোমরের ব্যথাই সর্বাপেক্ষা কষ্টদায়ক। অনেক সময় রোগী যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। এই জ্বর ২/৩ দিন থাকার পরে ছেড়ে যায় এবং মনে হয় যেন রোগী আরোগ্য লাভ করেছে কিন্তু ৪র্থ বা ৫ম দিনে আবার নতুন করে জ্বর বৃদ্ধি পায় এবং দুই এক দিন ভোগের পরে একেবারে ছেড়ে যায়।
দ্বিতীয় বার জ্বর বৃদ্ধির সময় অনেক রোগীর হাত পায়ে এবং বুকে এক প্রকার লাল উদ্ভেদ প্রকাশ পায়। ইহা দেখতে কিছুটা হামের মত এবং হাতের তালুতেই সর্বাপেক্ষা বেশী দেখা যায়। রোগ সেরে গেলেও রোগী অত্যন্ত দুর্বলতার ভাব অনুভব করে। রোগী এত দুর্বল যে মাথা স্থির করে দাঁড়াতে কষ্ট হয়। যে কোন ঋতুতেই এই রোগ বিস্তার লাভ করে । এইগুলো ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ
- পিঠে অন্যান্য স্থানে বিশেষ করে সন্ধিগুলোতে প্রচণ্ড ব্যথা।
- অত্যন্ত মাথা ব্যথা, পিপাসা, ক্ষুধাহীনতা, চোখমুখ লাল, নাড়ী দুর্বল, বমন, কোষ্ঠকাঠিন্য ।
- বগল, গলা এবং কুঁচকিতে গ্রন্থির স্ফীতি ।
- কম্প এবং শীত শীত করে জ্বর শুরু হয়, জ্বরের তাপমাত্রা যত বৃদ্ধি পেতে থাকে মাথার বেদনাও তত বৃদ্ধি পায়।
- জ্বর ২/৩ দিন পর ছেড়ে যায় বা কমে যায় কিন্তু আবার হয়।
- দ্বিতীয় বার জ্বরের সময় রোগীর হাত পা এবং বুকে এক প্রকার উদ্ভেদ বা Rash বের হয়।
- জ্বর সেরে গেলেও রোগীর দুর্বলতার ভাব বজায় থাকে।
- Incubation সময় ৫/৬ দিন থাকতে পারে তার পরেই রোগ শুরু হয়। রোগের বিপন্ন করে তীব্রতা বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন রকম। তবে রোগের লক্ষণগুলো ৭/১০ দিন পর্যন্ত চলতে পারে।
- চোখের যন্ত্রণা এবং বেদনা, আলোকাতঙ্ক এবং চোখ দিয়ে জল পড়া।
- এই রোগের সঙ্গে Leucopenia ভাবটি সর্বদাই বর্তমান থাকে।
- এই রোগের আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে লম্বা হাড়ের যে স্থানে টেন্ডন এবং লিগামেন্টগুলো শেষ হয়েছে (Insertion) সেখানে প্রচণ্ড ব্যথা থাকে। এই জন্যই ইহাকে হাড়ভাঙ্গা জ্বর বলা হয়।
- রোগীর ঘ্রাণ শক্তি এবং স্বাদ গ্রহণ শক্তির পরিবর্তন ঘটে।
ডেঙ্গু জ্বরের তাপমাত্র কীভাবে উঠানামা করে তা সঠিকভাবে বোঝানোর জন্য একটি চার্ট । এই চার্ট দেখে আমরা অতি সহজেই বুঝতে পারি এই জ্বরের বৃদ্ধি এবং হ্রাস কেমন করে সংঘটিত হয় এবং উদ্ভেদ প্রকাশ পায়।
এই জ্বরের পরে রোগী অতন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে এই দুর্বলতার সুযোগে অন্য কোন রোগ আক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। সন্ধি ও পেশীগুলোকে নাড়াচাড়া করতে অত্যন্ত কষ্টবোধ হয়। ইহার পুনরাক্রমণের সম্ভাবনা খুব কম।
এই জ্বরে পর উদরাময় এবং নানাবিধ উপসর্গ দেখা দেয় এবং সেগুলো সহজে আরোগ্যে হতে চায় না । এই রোগে মৃত্যু সংখ্যা খুব কম। অনেক সময় শিশু ও বৃদ্ধদের হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা, আক্ষেপ, প্রদাহ, মোহ প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দেয়।
তাপ কমে যাবার সময় Deptession হবার জন্য দুর্বল রোগীর মৃত্যু আশংকা দেখা দেয়।
ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত ক্লিনিকাল লক্ষণ এবং পরীক্ষাগার পরীক্ষার সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ণয় করা হয়। এখানে ডেঙ্গু নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত সাধারণ পদ্ধতিগুলি রয়েছে:
একজন ডাক্তার সাধারণত আপনার উপসর্গ সম্পর্কিত ইতিহাস এবং মশার সম্ভাব্য এক্সপোজার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। ডেঙ্গুর বৈশিষ্ট্য যেমন ফুসকুড়ি, জ্বর এবং পেশী বা জয়েন্টে ব্যথার মতো লক্ষণগুলি রোগীর মধ্যে বিদ্যমান কি না তা যাচাই করবে।
রক্ত পরীক্ষা পরীক্ষা মাধ্যমে বুঝতে পারা যায় রোগী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত কি না । WBC কাউন্ট কমে যায়। Platelets কাউন্ট কমে যায়। খুব দ্রুত বোঝা যাবে, এরকম একটি পরীক্ষা হলো NS1 test, এটি একদিনের মধ্যেই করা যায়। আরেকটি পরীক্ষা রয়েছে, Rapid Tests এটি পরীক্ষা করলে পরিষ্কার হয়ে যাওয়া যায় তার ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে কি না।
তা ছাড়া ও ডেঙ্গু ভাইরাস সনাক্ত করতে - পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (PCR), কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (CBC) টেস্ট গোলও করা যায়।
শীত অবস্থায় এবং রোগীর যখন অত্যন্ত শীত ভাব থাকে তখন একটি বোতলের মধ্যে গরম জল ভরে পায়ের তলায় এবং বগলের মধ্যে চেপে রাখলে এবং গরম জল বা অন্য কোন গরম পানীয় পান করতে দিলে শীঘ্রই শীতভাব কম যাবে এবং রোগী উপশমবোধ করবে।
অত্যন্ত ঘাম হতে থাকলে গরম জলে সামান্য Rectified Spirit মিশিয়ে গা ভাল করে মুছে দিলে ঘাম নিবারণ এবং শরীরের বেদনা ব্যথা কমে যাবে। পিপাসা দূর করার জন্য গরম জল ঠাণ্ডা করে পান করতে দেওয়া উচিত। রোগীরা সর্বদাই মশারীর মধ্যে রাখা উচিত। মশা ধ্বংস করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
যেখানে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা দিবে সেখানকার লোকদের সাবধান থাকার হবে। হিম, ঠাণ্ডা, আর্দ্রবাতাস লাগান উচিত নয়, টক খাওয়া নিষিদ্ধ। জ্বরকালীন সাবু, বার্লি, প্রভৃতি পথ্য দিবে। পেটের গোলযোগ না থাকলে দুধ দেওয়া যায়। রোগী আরোগ্য দান করলে জ্যান্ত মাছের ঝোল, মুগের ডাল এবং সরুচালের ভাত পথ্য হিসাবে দিবে।


