পাইলস (অর্শ) কী? লক্ষণ, কারণ এবং অপারেশান ছাড়া স্থায়ী সমাধানের উপায়

Dr. Md. Anas Sarkar
By -
0

  • মলদ্বার দিয়ে রক্তক্ষরণ?
  • মলদ্বারে চুলকানি ও ব্যথা?
  • মলদ্বারে চারপাশে ফোলা?
  • মলত্যাগ ও বসতে অসুবিধা?
  • তাহলে হয়তো আপনি পাইলসে ভুগছেন!

পাইলস - একটি নীরব যন্ত্রণার নাম।
পাইলস একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা যা কলেজ ছাত্র থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। এটি সাধারণত পায়ুপথের (Anal passage) আশেপাশে রক্তনালীগুলো ফুলে যাওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়। মেডিকেল ভাষায় একে হেমোরয়েডস (Hemorrhoids) বলা হয়।
বাংলাদেশে প্রতি চার জনে একজন কোনো না কোনো সময় পাইলস বা অর্শে ভোগেন। অনেকেই লজ্জা বা ভয় থেকে ডাক্তারকে জানান না, ফলে সমস্যা দিন দিন জটিল হয়ে ওঠে।

পাইলস-একটি নীরব যন্ত্রণার নাম


পাইলসের প্রকারভেদ:

পাইলসকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয় যেমন - অভ্যন্তরীণ (Internal Piles) এবং বহ্যন্তরীণ (External Piles) ।

অভ্যন্তরীণ পাইলস (Internal Piles):

বহ্যন্তরীণ পাইলস মলদ্বারের বাইরের অংশে শিরা ফোলার কারণে হয়। এখানে ব্যথা ও জ্বালা-পোড়া বেশি হয়। প্রাথমিক অবস্থায় ছোট গুটি দেখা দেয়। কখনো থ্রম্বোসিস হলে তীব্র ব্যথা এবং গাঢ় রঙের রক্তস্রাব হতে পারে।

বাহ্যিক পাইলস (External Piles)

মলদ্বারের ভেতরে শিরা ফোলে যায় ।
বাহ্যিক পাইলসকে গ্রেড অনুযায়ী ভাগকরা হয় যেমন - গ্রেড ১, গ্রেড ২, গ্রেড ৩, গ্রেড ৪।
  • প্রথম স্তরের পাইলস বাইরে বের হয় না - এটি মলদ্বারের ভেতরেই থাকে এব সাধারণত রক্তপাত হতে পারে কিন্তু বাইরে ঝুলে পরে না
  • দ্বিতীয় স্তরের পাইলস মলত্যাগের সময় বাইরে বের দেখা যায়, কিন্তু পরে নিজ থেকেই ভিতরে ঢুকে যায়, কোনো সাহায্য ছড়াই।
  • তৃতীয় স্তরের পাইলস মলত্যাগের সময় বাইরে বের হয়ে আসে এই পর্যায়ের পাইলস নিজ থেকে আর ভিতরে ফিরে যায় না এবং তা হাতে ঠেলে ভেতরে নিতে হয়।
  • চতুর্থ স্তরের পাইলস স্থায়ীভাবে বাইরে ঝুলে থাকে, হাত দিয়ে ঠেলেও ভেতরে নেওয়া যায় না এবং সাধারণত ব্যথা, জ্বালা, রক্তপাত ও অস্বস্থি বেশি হয়।

পাইলসের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • মলদ্বারে ব্যথা বা জ্বালা
  • চুলকানি বা অস্বস্তি
  • বসলে বা হাঁটলে অস্বস্তি
  • উজ্জ্বল লাল রঙের রক্তপাত (বিশেষত টয়লেটের সময় বা পরে)
  • মলদ্বারের চারপাশে শক্ত ও ফোলা গুটি

পাইলসের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  1. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া বা দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য পাইলসের অন্যতম প্রধান কারণ। যখন মল শক্ত হয়ে যায়, তখন সেটি বের করতে অনেক কষ্ট করতে হয়। এ সময় অতিরিক্ত চাপ পড়ার ফলে মলদ্বারের শিরাগুলো ফুলে যায় এবং ধীরে ধীরে পাইলসের সমস্যা তৈরি হয়।
  2. কম পানি পান করাও পাইলসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। প্রতিদিন গড়ে অন্তত ২ লিটার পানি পান করা প্রয়োজন। কিন্তু অনেকে যথেষ্ট পানি পান করেন না, ফলে মল শক্ত হয়ে যায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। যার কারণে পাইলস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
  3. আঁশযুক্ত খাবারের অভাবও পাইলসের বড় একটি কারণ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় যথেষ্ট পরিমাণে ফাইবার না থাকলে মল শক্ত হয়ে যায়। এতে কোষ্ঠকাঠিন্য তৈরি হয় এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিতে হয়, যার ফলে ধীরে ধীরে পাইলসের সমস্যা দেখা দেয়।
  4. দীর্ঘ সময় বসে থাকলে মলদ্বারের শিরায় রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। অফিস বা দীর্ঘসময় কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা, অথবা গাড়িতে দীর্ঘসময় যাত্রা করার ফলে এই সমস্যা হতে পারে।
  5. মলত্যাগের সময় টয়লেটে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা উচিত নয়। অতিরিক্ত সময় বসে থাকলে মলদ্বারের শিরায় চাপ পড়ে এবং পাইলসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

চিকিৎসা :

ঘরোয়া বা প্রাথমিক চিকিৎসা:

  • প্রচুর পানি খাওয়া
  • আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া
  • গরম পানিতে ১০–১৫ মিনিট বসা
  • ভিজা টিস্যু দিয়ে পরিষ্কার করা
পাইলস বা হেমোরয়েডস এমন একটি রোগ যা পুরুষ–মহিলা উভয়ের ক্ষেত্রেই হতে পারে। সাধারণত দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য, বেশি সময় ধরে টয়লেটে বসা, গর্ভাবস্থা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বা অনিয়মিত লাইফস্টাইলের কারণে পাইলস হয়।
এলোপ্যাথিক চিকিৎসায় আপনাকে শুরুতে কিছু মলম, পেইনকিলার বা ল্যাক্সেটিভ দেওয়া হয়। এগুলো সাময়িক স্বস্তি দিলেও আসল সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান আনে না। যখন আপনার পাইলস গ্রেড-৩ বা গ্রেড-৪ এ পৌঁছে যায়, তখন ডাক্তাররা সার্জারির পরামর্শ দেন।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে — সার্জারি কি আসলেই স্থায়ী সমাধান?
বাস্তবতা হলো, ৭০-৮০% রোগীর ক্ষেত্রেই কয়েক মাস বা বছর পরে পাইলস আবার ফিরে আসে। শুধু তাই নয়, পুনরায় হলে এটি অনেক সময় আরও জটিল আকারে দেখা দেয়।
অন্যদিকে, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পাইলসের মূল কারণের উপর কাজ করে।
হোমিওপ্যাথি শুধু রক্তপাত, ব্যথা, চুলকানি মতো উপসর্গগুলোকে সাময়িক সময়ের জন্য কমায় না, বরং রক্তনালীর দুর্বলতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, হজমের গোলমালসহ মূল কারণের উপর কাজ করে। তাছাড়াও হোমিওপ্যাথি শুধু পাইলসের চিকিৎসা নয়, একইসাথে কোষ্ঠকাঠিন্য, হজম সমস্যা, মানসিক দুশ্চিন্তা – সবকিছুর উপরে কাজ করে।
সবচেয়ে বড় কথা, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নিরাপদ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দেয়।
যারা পাইলসের সমস্যায় ভুগছেন বা সন্দেহ করছেন, তারা সময় নষ্ট না করে একজন অভিজ্ঞ ও রেজিস্টার্ড হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন এবং সঠিক পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)