আমরা এমন সাতটি লক্ষণ নিয়ে আলোচনা করছি, যার দিকে তরুণদের বিশেষভাবে মনোযোগ দেওয়া উচিত। আপনি যদি এই সমস্যাগুলোর মধ্যে কোনো একটির সম্মুখীন হন, তবে সম্ভাবনা থেকে যায়_ আপনি ভারিকোসিলে আক্রান্ত।
তাই, দয়া করে আপনার অণ্ডকোষের স্বাস্থ্য বা ব্যক্তিগত অঙ্গের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিন। যদিও এই আর্টিকেলটি অবিবাহিত ও তরুণ ছেলেদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটি বিবাহিত পুরুষ ও তাদের পরিবারের জন্যও সমানভাবে জরুরি। কারণ আজকালকার ছেলেরা প্রায়শই তাদের সমস্যাগুলো পরিবারকে খুলে বলতে পারে না। আমরা রোগীদের কাছ থেকে প্রায়ই এমন টেক্সট পাই, যেখানে তারা জানান, "স্যার, আমার এই সমস্যাটি আছে কিন্তু আমি বাবা-মাকে জানাতে পারছি না"। অনেকেই লজ্জায় বলেন না,
কিন্তু এ রোগ আপনার ভবিষ্যত, আত্মবিশ্বাস, এমনকি দাম্পত্য জীবন পর্যন্ত নষ্ট করে দিতে পারে।
আমি ডা. আনাস সরকার, আল-বারাকা হোমিও হলে প্রতিদিন এমন অনেক তরুণকে দেখি, যারা আসেন চুপচাপ মুখ নিচু করে — বলেন, “স্যার, আমি আমার সমস্যাটা কাউকে বলতে পারছি না…
কেউ কেউ এতটাই মানসিক চাপে থাকেন যে আত্মহত্যার চিন্তাও করেন।
ভেরিকোসিল এর লক্ষণগুলো আলোচনা করার আগে, ভেরিকোসিল কী, তা একটু জেনে নেওয়া যাক।
অণ্ডকোষ থেকে রক্ত মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিরুদ্ধে (উপরের দিকে) টেস্টিকুলার ভেইন এর মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডে ফিরে যায়। এই শিরাগুলোতে ছোট ছোট কপাটিকা বা one-way valves থাকে। এই কপাটিকাগুলো নিশ্চিত করে যে রক্ত শুধু উপরের দিকে, অর্থাৎ হৃৎপিণ্ডের দিকে যাবে, এটি যেন নিচের দিকে ফিরে না আসে। তা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এই রক্ত হলো ডি-অক্সিজেনেটেড (deoxygenated) এবং এতে বিষাক্ত উপাদান বা 'টক্সিন' ও 'ফ্রি র্যাডিক্যাল' থাকে।
যদি এই বিষাক্ত রক্ত সঠিকভাবে হৃৎপিণ্ডে ফিরে না যায়, তবে এটি অণ্ডকোষের ক্ষতি করতে পারে।
হস্তমৈথুনে আসক্তি এবং এক সময় হঠাৎ ছেড়ে দেওয়া, ভারী জিনিস উত্তোলনের কাজ করা, সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ, দীর্ঘদিন যাবৎ ক্রমাগত দাঁড়িয়ে কাজ করা, দীর্ঘদিন যাবৎ ক্রমাগত গরমে কাজ করা, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমেরে কারণে—এই one-way valves গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন রক্ত নিচের দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে। তখন অণ্ডকোষে শিরাগুলোতে রক্ত জমাট বাঁধার কারণে অণ্ডকোষে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয় ।
যখন এই রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে বা যখন এটি অণ্ডকোষের ক্ষতি করা শুরু করে, তখন কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো। আপনি যদি এই লক্ষণগুলোর মধ্যে কোনোটি লক্ষ্য করেন, তবে একজন এক্সপার্ট হোমিও ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।
এখন আসুন জেনে নেই— ভেরিকোসিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলো। প্রথমেই বলি একটি ক্লাসিক সাইন, যেটা প্রায় সব রোগীর ক্ষেত্রেই দেখা যায়…
১. ব্যাগ অফ ওয়ার্মস'(Bag of worms) অনুভূতি
অর্থাৎ, থলের মধ্যে একগুচ্ছ কেঁচো বা কৃমি থাকলে যেমন অনুভূত হয়, ঠিক তেমন যা স্পর্শ করলে মনে হয় অণ্ডকোষের ত্বকের নিচে একগুচ্ছ জট পাকানো কৃমি বা কেঁচো রয়েছে।
ভ্যারিকোসিলে আক্রান্ত রোগীরা সাধারণত প্রথমেই এই অনুভূতির কথাই বলেন। তাদের মনে হয়, অণ্ডকোষের আশেপাশে কিছু যেন কিলবিল করছে বা নড়ছে — যদিও বাস্তবে সেখানে কোনো পোকা বা কৃমি নেই। আসলে এটি ঘটে ত্বকের নিচের ফোলা ও জট পাকানো শিরাগুলোর কারণে, যেগুলো দেখতে ও অনুভবে ঠিক কেঁচোর মতো লাগে। এই লক্ষণটিই ভেরিকোসিলের সবচেয়ে সাধারণ ও ক্লাসিক লক্ষণ।
এখন আসা যাক পরবর্তী লক্ষণটিতে —
২. অণ্ডকোষে অস্বাভাবিক চাকা বা ফোলাভাব অনুভব করা
ভেরিকোসিলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হলো অণ্ডকোষে (scrotum) শক্ত চাকা (lump) বা ফোলাভাব অনুভব করা।
অনেক রোগী একগুচ্ছ কেঁচো বা কৃমি থাকার অনুভূতির পরিবর্তে অণ্ডকোষে একটি পিণ্ড বা চাকার উপস্থিতি টের পান। এই চাকা বা ফোলাভাবটি অণ্ডকোষের একপাশে বা নির্দিষ্ট কোনো স্থানে অনুভূত হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চাকা অনুভব করার মানেই কিন্তু কোনো টিউমার বা ভিন্ন কোনো ক্ষতিকর পিণ্ড নয়।
অনেক ক্ষেত্রে, ভেরিকোসিলে আক্রান্ত শিরাগুলো যখন অতিরিক্ত ফুলে ওঠে এবং একসঙ্গে জট পাকিয়ে গুচ্ছবদ্ধ (clumped) হয়ে যায়, তখন সেটিকে বাইরে থেকে স্পর্শ করলে একটি শক্ত চাকার মতোই মনে হতে পারে। যদি এমন কোনো চাকা বা ফোলাভাব অনুভব করেন, তবে অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
৩. ব্যথা বা অস্বস্তি
ভেরিকোসিলের আরেকটি খুব সাধারণ লক্ষণ হলো অণ্ডকোষে ব্যথা বা অস্বস্তিকর অনুভূতি। এই ব্যথাকে সাধারণত রোগীরা মিষ্টি ব্যথা, হালকা ব্যথা বা dull pain হিসেবে বর্ণনা করেন যা রোগীকে খুবই অসস্থিতে ফেলে। এই ব্যথা সাধারণত তখনই বেশি হয়, যখন দীর্ঘক্ষণ বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, গরমে কাজ করতে হয় বা দিনের শেষে ক্লান্ত অবস্থায়। এতে অণ্ডকোষের শিরাগুলো আরও ফুলে উঠে, টান পড়ে, এবং সেখান থেকেই ব্যথা শুরু হয়।
এই ব্যথার কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে:
- প্রথমে এটি হালকা ব্যথা হিসেবে শুরু হয়।
- দীর্ঘ সময় বসে বা দাঁড়িয়ে থাকলে ধীরে ধীরে ব্যথা বাড়ে।
- ব্যায়াম বা হাটাহাটি করলে এটি তীব্র হয়, কিন্তু যখন রোগী বিশ্রাম নেয় বা শুয়ে থাকেন, তখন এটি কমে আসে।
সাধারণত গ্রীষ্মকালে ব্যথা বাড়ে, কারণ এই সময় শিরাগুলো বেশি প্রসারিত হয়, এবং শীতকালে ব্যথা কমে যায়। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো দেখে সহজেই বোঝা যায় যে এটি ভেরিকোসিল-সম্পর্কিত ব্যথা, যা উপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
৪. একটি অণ্ডকোষ অন্যটির চেয়ে নিচে ঝুলে থাকা
চতুর্থ লক্ষণটি হলো, রোগীরা লক্ষ্য করতে পারেন যে তাদের একটি অণ্ডকোষ অন্যটির চেয়ে নিচে ঝুলে আছে । এই অস্বাভাবিক ঝুলে থাকার মূল কারণটি ভেরিকোসিল-জনিত শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভেরিকোসিলের কারণে অণ্ডকোষের চারপাশে শিরাগুলোতে অতিরিক্ত রক্ত জমা হয়, যা সেই স্থানের উষ্ণতা বাড়িয়ে দেয়।
আমাদের অণ্ডকোষ স্বাভাবিকভাবেই শরীরের বাইরে থাকে, যাতে এটি পর্যাপ্ত শীতল অবস্থায় থাকতে পারে এবং স্বাভাবিক টেস্টোস্টেরন ও শুক্রাণু উৎপাদন বজায় রাখতে পারে কিন্তু শিরায় জমাট বাঁধা রক্ত অতিরিক্ত উষ্ণতা তৈরি করে, ফলে অণ্ডকোষের পেশী স্বাভাবিকভাবে শিথিল হয়ে যায় এবং অণ্ডকোষ আরও নিচে ঝুলে যায়।
৫. অণ্ডকোষের আকার ছোট হয়ে যাওয়া (Testicular Atrophy)
ভেরিকোসিল যদি দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা না করা হয় এবং রোগের তীব্রতা বাড়ে, তবে এটি আরও গুরুতর শারীরিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এর মধ্যে একটি হলো অণ্ডকোষের আকার ছোট হয়ে যাওয়া বা সংকুচিত হওয়া।
কখনও কখনও আপনি লক্ষ্য করতে পারেন যে আগে দুটি অণ্ডকোষ একই আকারের ছিল, কিন্তু হঠাৎ করে একটি ছোট হতে শুরু করেছে। এটি সাধারণত বাম দিকে বেশি দেখা যায়, কারণ ভেরিকোসিলও বাম দিকে বেশি হয়ে থাকে।
৬. বন্ধ্যাত্ব (Infertility)
ভেরিকোসিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু নীরব সমস্যাগুলির মধ্যে অন্যতম হলো বন্ধ্যাত্ব। ভেরিকোসিল পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
অনেক সময় রোগীর কোনো শারীরিক ব্যথা, ফোলা বা অণ্ডকোষ ঝুলে যাওয়ার মতো স্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে।এই ধরনের ক্ষেত্রে, দম্পতি যখন সন্তান ধারণে ব্যর্থ হন এবং চিকিৎসার জন্য যান, তখন পরীক্ষার মাধ্যমে ভেরিকোসিল ধরা পড়ে। ভেরিকোসিল তখন বন্ধ্যাত্বের একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
যদিও প্রতিটি ভেরিকোসিল বন্ধ্যাত্বের জন্য দায়ী নয়, তবুও এটি একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। সুসংবাদ হলো, যখন ভেরিকোসিলের জন্য হোমিও চিকিৎসা নিবেন তখন ভেরিকোসিলের সাথে বন্ধ্যাত্বের সমস্যাটি ভালো হয়ে যাবে।
৭. টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার লক্ষণ
সর্বশেষ সমস্যাটি হলো টেস্টোস্টেরন হ্রাসের কারণে রোগীর যৌন আকাঙ্ক্ষা বা সেক্স ড্রাইভ কমে যায়। শরীরে সামগ্রিক ক্লান্তি বা অবসাদ বেড়ে যায় এবং সবসময় দুর্বল লাগতে থাকে,পেশীর ভর কমতে শুরু করে এবং ফ্যাট বা চর্বি বাড়তে শুরু করে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে, রোগী উদ্বিগ্ন ও বিষণ্ণতায় ভুগতে থাকেন। হৃদপিণ্ডের পেশীর জন্য টেস্টোস্টেরন অপরিহার্য হওয়ায়, টেস্টোস্টেরন হ্রাসের কারণে কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যও প্রভাবিত হতে পারে। অণ্ডকোষের প্রধান দুটি কাজ হলো শুক্রাণু উৎপাদন এবং টেস্টোস্টেরন উৎপাদন। যখন ভেরিকোসিলের কারণে অণ্ডকোষ টেস্টোস্টেরনের উৎপাদনে প্রবাব পরে, তখনই এই সমস্যাগুলো দেখা দেয়।
পরামর্শ ও চিকিৎসা:
সুতরাং, আপনি যদি এই লক্ষণগুলোর মধ্যে কোনোটি অনুভব করছেন, তবে তা উপেক্ষা করবেন না। অবিলম্বে একজন এক্সপার্ট হোমিও ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।
আরেকটি বেশ সাধারণ ঘটনা হলো — অনেকেই সামরিক বাহিনী বা পুলিশের মেডিকেল পরীক্ষার সময় হঠাৎ করে জানতে পারেন যে তাদের ভেরিকোসিল রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কোনো লক্ষণ বা অস্বস্তি থাকে না, কিন্তু পরীক্ষার রিপোর্টে এই সমস্যা ধরা পড়ায় চাকরি থেকে বাদ পড়তে হয়। ফলে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং তখনই চিকিৎসার খোঁজ শুরু করেন।
পুরুষদের অন্ডকোষের ভেরিকোসিল যেকোন বয়সেই হতে পারে। তবে যথা সময়ে সঠিক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিলে এই সমস্যা খুব তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যায়। জেনে রাখা ভালো বহু রোগ রয়েছে যেগুলির কোন স্থায়ী এলোপ্যাথিক চিকিৎসা নেই। ভেরিকোসিল হলো তেমনই একটি রোগ যার তেমন কোন এলোপ্যাথিক চিকিৎসা নেই।
এলোপ্যাথিক ডাক্তাররা আপনাকে ফলোআপে রাখবে এবং কিছু পেইনকিলার খেতে দিবে যখন আপনার ভেরিকোসিল গ্রেড-৩ বা গ্রেড-৪ চলে যায় এবং আপনার রোগটি ক্রনিক ও জটিল আকার ধারণ করে তখন তারা আপনাকে সার্জারি করতে বলবে।
সার্জারি তে স্থায়ী ভাবে ভালো হয়ে গেলে আমি আপনাকে সার্জারি করতে পরামর্শ দিতাম কিন্তু ৮০% রুগীর ক্ষেত্রে ভেরিকোসিলটি ৫/৬ মাসের মধ্যে পুনরায় দেখা দেয় এবং তা আগের তুলনায় আরো জটিল আকারে।
সুতরাং ভেরিকোসিল রোগে আপনার হাতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যতীত অল্টারনেটিভ কোনো অপশন নেই। ভেরিকোসিলে আক্রান্ত হলে বা সন্দেহ হলে দ্রুত একজন রেজিস্টার হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের শরণাপন্ন হন এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করুন।
নিরাপদ থাকুন, সচেতন থাকুন।
আল্লাহ হাফেজ

