Lachesis
ঔষধ পরিচয়, নরেন্দ বন্দোপাধ্যায় (হোমিওপ্যাথি মেটেরিয়া মেডিকা)
নিদ্ৰায় বৃদ্ধি।
Lachesis একটি সুগভীর শক্তিশালী ঔষধ। ইহার অপব্যবহারজনিত কুফল সহজে দূরীভূত হয় না। ইহা ভয়ঙ্কর বিষধর সর্পের বিষ হইতে প্রস্তুত হইয়াছে এবং মনুষ্য সমাজ আজ সর্পরাজ্যে পরিণত প্রায় বলিয়া ইহার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়িয়া চলিয়াছে। বস্তুত দূষিত, বিষাক্ত ও মারাত্মক রোগে Lachesis কে অনন্য সাধারণ বলিয়া গ্রহণ করা উচিত। Lachesis এর রোগী কদাচিত স্থূলকায় হয় অর্থাৎ প্রায়ই সর্পের মত ছিপছিপে, যদিও ক্ষেত্র বিশেষে ইহার ব্যতিক্রমও দেখা যায়। Lachesis এর রোগী তাহার বামপার্শ্বে চাপিয়া শুইতে পারে না (Phosphorus)।
Lachesis এর প্রথম কথা - নিদ্রায় বৃদ্ধি, অর্থাৎ রোগ যাহা কিছু হউক না কেন, যদি দেখা যায় রোগী নিদ্রা যাইলেই তাহা বৃদ্ধি পায় এবং এত বৃদ্ধি পায় যে সে আর নিদ্রা যাইতে পারে না - নিদ্রা ভাঙ্গিয়া জাগিয়া উঠিতে বাধ্য হয়, তাহা হইলে প্রথমেই একবার Lachesis এর কথা মনে করা উচিত। নিউমোনিয়া বলুন, হাঁপানি বলুন, ক্যান্সার বলুন, কার্বাঙ্কল বলুন Lachesis হইলে নিদ্রায় বৃদ্ধি থাকিবেই থাকিবে। Lachesis আরও অনেক লক্ষণ আছে বটে কিন্তু নিদ্রায় বৃদ্ধিই তাহার শ্রেষ্ঠ পরিচয়। এজন্য Lachesis এর রোগী নিদ্রা যাইতে ভয় পায়, নিদ্রা হইতে দূরে থাকিতে চাহে অর্থাৎ নিদ্রা যাইতে চাহে না। সে জানে নিদ্রা যাইলেই তাহার যন্ত্রণা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাইয়া অসহ্য হইয়া দাঁড়াইবে। জাগ্রত অবস্থায় তাহার যন্ত্রণা যে একেবারেই থাকে না এমন নহে কিন্তু নিদ্রিত হইয়া পড়িলে তাহা যেন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায় এবং তখন সে জাগিয়া উঠিতে বাধ্য হয় । জাগিয়া উঠিয়া নিজেকে ধিক্কার দিতে থাকে কেন সে নিদ্রা গিয়াছিল (Grindelia)।
মৃগী নিদ্রাকালে বৃদ্ধি পায়, হাঁপানি নিদ্রাকালে বৃদ্ধি পায়, গলক্ষত, কার্বাঙ্কল প্রভৃতি যাবতীয় রোগ বা রোগের যন্ত্রণা নিদ্রাকালে বৃদ্ধি পায়।
নিদ্রাকালে দম বন্ধ হইয়া যাওয়া - Lachesis এর বিষ হৃৎপিণ্ডের উপর বেশি প্রভাব বিস্তার করে বলিয়া তাহার সকল রোগেরই সহিত হৃৎপিণ্ডের কিছুনা কিছু গোলযোগ বর্তমান থাকে। এমন কি আপাত সুস্থাবস্থাতেও রোগী নিদ্রা যাইবার সময় হঠাৎ জাগিয়া ওঠে যেন তাহার দম বন্ধ হইয়া গিয়াছিল (Digitalis, Grindelia)।
শ্বাসকষ্ট ও বুক ধড়ফড় করা - হৃৎপিণ্ডের গোলযোগবশত Lachesis এ শ্বাসকষ্ট ও বুক ধড়ফড় করা যেন স্বাভাবিক। কিন্তু সেখানেও নিদ্রার বৃদ্ধি এত প্রবলভাবে প্রকাশ পায় যে রোগী আর শুইয়া থাকিতে পারে না, উঠিয়া বসিতে বাধ্য হয়। কিন্তু হায়! যে নিদ্রা শোকে সান্ত্বনা, দুঃখে বিস্মৃতি, শ্রান্তিতে আরাম, শঙ্কাতে নির্ভয়, তাহার চির পবিত্র সুকোমল কোলে Lachesis এর যন্ত্রণা বৃদ্ধি পায় কেন; কারণ সে যে আশীবিষ, সে যে ঈর্ষা মূর্তিমতী।
ঈর্ষা, স্পর্শকাতরতা ও বাচালতা।
ঈর্ষা,স্পর্শকাতরতা ও বাচালতা Lachesis এর অন্যতম বিশিষ্ট পরিচয়। মানসিক স্পর্শকাতরতায় দেখা যায় সে অত্যন্ত খিটখিটে স্বভাব, অল্পেই উত্তেজিত হইয়া ওঠে, অতিশয় অবিশ্বাসী, ঔষধ খাইতে চাহে না মনে করে তাহাকে বিষ দেওয়া হইতেছে, মনে করে তাহার পশ্চাতে শত্রু ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, মনে করে তাহার স্বামী অন্য স্ত্রীলোকের প্রেমাসক্ত এবং এইরূপ সন্দেহ ও ঈর্ষায় তাহার মন এত ভাঙ্গিয়া পড়ে যে উন্মাদগ্রস্ত হইতেও বিলম্ব থাকে না। তাহাপেক্ষা সুন্দরী বা তাহাপেক্ষা গুণবতী স্ত্রীলোকের কথা শুনিলে ঈর্ষায় তাহার বুক জ্বলিয়া যাইতে থাকে, তাহাদিগকে ব্যঙ্গ করিতে থাকে। Lachesis এর স্ত্রী ইচ্ছা করে না যে তাহার স্বামী অন্য কোন স্ত্রীলোকের দিকে চাহিয়া দেখে এবং অন্য কোন স্ত্রীলোক তাহাপেক্ষা রূপবতী, গুণবতী বা ভাগ্যবতী হইলে সে তাহার মুখদর্শন করিতেও চাহে না। এমন কি আপন সহোদরাদের মধ্যে কেহ যদি তাহার গৃহে একটু ঘন ঘন যাতায়াত করে তাহা হইলে ঈর্ষায় এবং সন্দেহে তাহার মন ভরিয়া ওঠে, সে স্পষ্টভাবে বলিয়া বসে যে এরূপ আসা-যাওয়া সে পছন্দ করে না এবং স্বামীর উপরও সতর্ক দৃষ্টি রাখে। কিন্তু অঙ্গার যেমন নিজে দগ্ধ না হইয়া অন্যকে দগ্ধ করিতে পারে না, ঈর্ষার স্বভাবও ঠিক তেমনই, তাই Lachesis এ আমরা প্রত্যক্ষ করি, ঈর্ষাজনিত মৃগী, ঈর্ষাজনিত হৃদরোগ, ঈর্ষাজনিত উন্মাদ।
ধর্মভাবও আছে; বিশ্বাসও অগাধ। কখনও বা মনে করে তাহার মধ্যে কোন দেবযোনি বা প্রেতযোনি আশ্রয় লইয়াছে, তাঁহার প্রত্যাদেশ সে শুনিতে পায়—ভবিষ্যৎবাণী করিতে থাকে। অত্যন্ত সেবাপরায়ণা, অবিশ্বাসী, আনন্দে অশ্রুপাত, কামোন্মাদ, ব্যঙ্গপটু, রোগের কথা মনে হইলেই রোগ বৃদ্ধি পায় (Medorrhinum)।
এক্ষণে তাহার শারীরিক স্পর্শকাতরতা সম্বন্ধে আলোচনা করিতে গেলে দেখা যায় সে চুল আঁচড়াইতে পারে না, গলায় জামার বোতাম দিতে পারে না, কোমরে কাপড় আঁটিয়া পরিতে পারে না, জুতার ফিতা বাঁধিতে পারে না। অবশ্য আজকাল মেয়েদের মধ্যে লোল কবরী এবং ছেলেদের মধ্যে গলার বোতাম খুলিয়া জামা পরা একটি প্রচলন হইয়া দাঁড়াইয়াছে। কিন্তু Lachesis এর কাছে ইহা কোন সখ বা প্রচলন নহে। স্পর্শকাতর তাই তাহার একমাত্র কারণ। আপাত সুস্থ অবস্থাতেও Lachesis রোগী গলায় কোনরূপ মালা পরিতে পারে না, গলার বোতাম লাগাইতে পারে না, শয়নকালে গায়ের চাদর গলার উপর টানিয়া লইতে পারে না, খোঁপা বাঁধিতে পারে না, কোমরে কাপড় ঢিলা করিয়া পরে। অসুস্থ অবস্থায় ইহা এত বেশি বৃদ্ধি পায় সে শ্বাসকষ্ট হইতে থাকিলে যদিও বাতাস সে পছন্দ করে কিন্তু নাক বা মুখের অতি সন্নিকটে বাতাস করা সে পছন্দ করে না। এবং তখন শরীরের কোন স্থানে কোনরূপ স্পর্শ বা বাঁধন তাহার কাছে একেবারেই অসহা হইয়া যায়। জ্বর হউক, নিউমোনিয়া হউক, কার্বাঞ্চল বা উন্মাদ Lachesis এর সকল ক্ষেত্রেই এইরূপ স্পর্শকাতরতা বিদ্যমান থাকে। গা এতো স্পর্শকাতর যে আবরণ রাখিতে পারে না (Apis mal, Hepar sulph)।
পূর্বেই বলিয়াছি ঈর্ষা, ঘৃণা এবং সন্দেহে মনুষ্য সমাজ আজ সর্পরাজ্যে পরিণত হইয়াছে এবং সেইজন্য রোগের মারাত্মকতাও বৃদ্ধি পাইয়াছে বলিয়া Lachesis ও আজ আমাদের একটি নিত্য প্রয়োজনীয় ঔষধ। প্লেগ, ইরিসিপেলাস, ডিপথিরিয়া বা কার্বাঙ্গল প্রভৃতি তরুণ প্রদাহ যাহা ২৪ ঘন্টার মধ্যে সাংঘাতিক হইয়া দাঁড়ায় সে সব ক্ষেত্রে Lachesis যেমন ফলপ্রদ, ক্ষয়দোষ, উপদংশ প্রভৃতি চিররোগেও Lachesis এর তুলনা নাই বলিলেও চলে।
আপনারা সকলেই জানেন বাচালতা ক্ষয়দোষের একটি নিদর্শন এবং Lachesis এ তাহা এত বেশি যে এ সম্বন্ধে বোধ করি, কোন ঔষধই তাহার সমকক্ষ হইতে পারে না। কাজেই যেখানে বাচালতা, সেইখানে ক্ষয় এবং যেখানে ক্ষয় বা মারাত্মকতা সেইখানেই Lachesis কিছু বিচিত্র নহে। বিচিত্র তাহার বাচালতা। সে এক দণ্ড চুপ করিয়া থাকিতে পারে না এবং একজনের সহিত কথা বলিতে বলিতে অন্য একজনের সহিত বা এক বিষয়ে কথা বলিতে বলিতে অন্য বিষয়ে কথা বলা তাহার কাছে একান্ত স্বাভাবিক। কথার পর কথা, গল্পের পর গল্প, একজন হইতে দশজন, এক বিষয় হইতে বিভিন্ন বিষয় তাহার মুখে যেন লাফালাফি করিতে থাকে। যখন একা থাকে তখনও মুখ বুজিয়া থাকিতে পারে না, আপন মনেই বকিয়া যাইতে থাকে।
ডাক্তারের কাছে রোগের ইতিহাস দিতে গিয়া কিরূপ বংশের মেয়ে তিনি, কিরূপ পরিশ্রম করিতে পারিতেন, কত সাধ করিয়া ছেলের বিবাহ দিয়াছিলেন, কি সর্বনাশী বউ আসিয়াছে ইত্যাদি অবান্তর কথা, একটার পর একটা এমন বকিয়া যাইতে থাকিবে যে ডাক্তার তাহার রোগ সম্বন্ধে দুইটি কথা জিজ্ঞাসা করিবারও অবসর পাইবেন না। সময় সময় বাড়ির লোক বিরক্ত হইয়া বলিতে বাধ্য হয় যে তাহার মাথা কি খারাপ হইয়া গেল। কিন্তু সর্বনাশ! তাহাতে ফল আরও বিপরীতই ফলে। কাঁদিয়া - কাটিয়া, কপালে করাঘাত করিয়া সে এক প্রলয় কাণ্ড করিয়া বসে। পিতা হও বা পুত্র হও, স্বামী হও বা ভ্রাতা হও, প্রতিবাদ করিয়াছ কি মরিয়াছ, পৃথিবীর সকল ঈর্ষা, সকল সন্দেহ পুঞ্জীভূত হইয়া Lachesis এর জিহ্বায় মূর্ত হইয়া উঠিবে।তখন তাহার ভীমা-ভৈরবী মূর্তি দেখে কে? তখন তাহার হাত-পা মুখ ও চোখ সর্বাঙ্গ যেন মুখর হইয়া ওঠে বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে (Stramonium)। দিন ক্ষণ সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা, যেমন রবিবারকে সোমবার বা বিকালকে সকাল মনে করে।
কম্পমান জিহ্বা - Lachesis এ দুর্বলতা খুব বেশি এবং সেই দুর্বলতা বিশিষ্টভাবে প্রকাশ পায় তাহার জিহ্বায়। তাহাকে জিহ্বা বাহির করিয়া দেখাইতে বলিলে সে তাহা পারে না। দাঁতের মধ্যেই জিহ্বা আটকাইয়া থাকে কিম্বা তাহা বাহির করিতে গেলে দেখা যায় তাহা কাঁপিতেছে। এই কম্পমান জিহ্বা এবং কণ্ঠ ও কটিদেশের স্পর্শকাতরতা এবং শরীরের বামদিক, বাচালতা ও নিদ্রায় বৃদ্ধি Lachesis এর শ্রেষ্ঠ পরিচয়। ঠোঁট লালবর্ণ (Sulphur, Tuberculinum)। মাথার চুল ছিঁড়িতে থাকে। দাঁত করাতকাটা (Medorrhinum, Plumbum met, Syphilinum, Bacillinum )।
বাম অঙ্গে রোগাক্রমণ বা প্রথমে বামদিক পরে ডান দিক।
Lachesis এর রোগগুলি বেশি ক্ষেত্রেই শরীরের বামদিকে প্রকাশ পায় অথবা প্রথমে বামদিকে প্রকাশ পাইয়া ক্রমশ ডান দিকে অগ্রসর হইতে থাকে। বাম কণ্ঠ, বাম ফুসফুস, বাম ডিম্বকোষ বা অন্ডকোষ বা শরীরের বামদিকে আক্রমণ করাই Lachesis এর স্বাভাবিক রীতি এবং তারপর শরীরের ডান দিকেও সে আক্রমণ করিতে পারে। এই জন্য ডিপথিরিয়া হইলে প্রথমে বাম কণ্ঠই আক্রান্ত হয়। নিউমোনিয়া হইলে প্রথমে বাম ফুসফুসই আক্রান্ত হয় এবং যথাসময়ে উপযুক্ত ঔষধ না পড়িলে ক্রমশ ডান কণ্ঠ এবং ডান ফুসফুসও আক্রান্ত হইয়া পড়ে। Lachesis এর রোগাক্রমণের রীতি এইরূপ। শিরঃশূল এবং সায়েটিকা কখনও কখনও বা কোন কোন ক্ষেত্রে ডান দিকে প্রকাশ পায়। একথাটিও মনে রাখা উচিত।
হৃৎপিণ্ডের উপরও তাহার প্রভাব খুব প্রচণ্ডভাবেই পরিলক্ষিত হয়। হৃৎপিণ্ডের বিবৃদ্ধি, হৃৎপিণ্ডের শোথ, হৃদয়শূল, হৃদকম্প বা বুক ধড়ফড়ানি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ইত্যাদি। হাঁপানি এবং বুক ধড়ফড়ানি নিদ্রাকালে বৃদ্ধি পায় এবং এত বৃদ্ধি পায় যে সে ঘুম ভাঙ্গিয়া জাগিয়া উঠিয়া সম্মুখ দিকে ঝুঁকিয়া বসিতে বাধ্য হয়। তখন শুইয়া থাকা তাহার কাছে একেবারেই অসম্ভব হইয়া পড়ে এবং গলায় বা কোনরূপ বাঁধন বা স্পর্শ সহ্য করিতে পারে না। বাতাস পছন্দ করে বটে কোমরের কিন্তু নাকে বা মুখের কাছে বাতাস করা সে পছন্দ করে না। দূর হইতে বাতাস করা পছন্দ করে। শ্বাসকষ্টের সহিত মাথা গরম বা উত্তপ্ত হইয়া ওঠে কিন্তু দেহ বরফের মত ঠাণ্ডা হইয়া আসে।
হাতুড়ীর আঘাতের মত স্পন্দনাভূতি বা দপদপ করা Lachesis এর দেহের সর্বত্র হৃদস্পন্দনের তালে তালে রক্ত দপদপ্ করিতে করিতে মাথায় উঠিতে থাকে এবং হাত - পা ঠাণ্ডা বরফের মত হইয়া আসে। মাথাব্যথাই হউক বা ভগন্দরই হউক প্রদাহ মাত্রই এইরূপ অনুভূতি। হৃদকম্প বা বুক ধড়পড় করা শরীরের ডান দিক চাপিয়া গুইলে কম পড়ে। উঠিয়া বসিলেও কম পড়ে। শ্বাসকষ্ট সোজা হইয়া বসিয়া থাকিলে উপশম (Lycopodium)।
বামহস্ত অসাড়; বাম অঙ্গে পক্ষাঘাত। বিশেষত অ্যাপোপ্লেক্সির পর। হাতের তালু, পায়ের তলা এবং ব্রহ্মতালু জ্বালা করিতে থাকে।
বিশেষত ঋতু অন্তকালে স্ত্রীলোকদের ব্রহ্মতালুতেই নিদারুণ জ্বালাবোধ। মুখ দিয়া সূতার মত লালা নিঃসরণ (Kali bai, hydrastis, Grindelia—Grindelia হাঁপানির শ্লেষ্মাস্রাব দড়ির মত লম্বা হইয়া কিছুতেই ছিঁড়িতে চাহে না)।
জলপানের পর বমনেচ্ছা, জলাতঙ্ক, জল গিলিতে পারে না। নাক খুঁটিয়া রক্তপাত করা (arum triphyllum)। তৃষ্ণা বা তৃষ্ণাহীনতা।
নির্গমনে নিবৃত্তি।
Lachesis এ হাঁপানি সর্দি উঠিলেই কম পড়ে, ঋতুকালীন যন্ত্রণা ঋতু দেখা দিবার সঙ্গে কম পড়ে, বুকের মধ্যে চাপবোধ উদগার উঠিলে কম পড়ে এবং ঘর্ম দেখা দিলেই জ্বর ছাড়িয়া যায়। খোস-পাঁচড়ার মধ্যে যতক্ষণ চুলকানি বর্তমান থাকে ততক্ষণ সে অপেক্ষাকৃত ভালই থাকে, চুলকানি বন্ধ হইলে হাঁপানি দেখা দেয়। নির্গমনের নিবৃত্তি Lachesis এর এমনই একটি চমৎকার লক্ষণ।
Lachesis এর সকল স্রাব এবং সকল প্রদাহ দেখিতে নীলবর্ণ, সবুজবর্ণ বা কালবর্ণ হয়। এইজন্য ইরিসিপেলাস, সেলুলাইটিস, কার্বাঙ্কল প্রভৃতি প্রদাহ এবং সর্দি বা শ্লেষ্মা, লিউকোরিয়া, রজঃ বা ঋতু, এমন কি মাতৃস্তন্যও সবুজবর্ণ, নীলবর্ণ বা কালবর্ণ হয় । স্রাব বা প্রদাহের এই বর্ণও Lachesis এর এতবড় বৈশিষ্ট্য যে অনেক সময় তাহা লক্ষ্য করিয়াই আমরা ঔষধ নির্বাচনে সুবিধা পাই। হাত বা পায়ের সন্ধিস্থল মচকাইয়া নীলবর্ণ দেখাইলেও Lachesis বেশ উপকারে আসে (Arnica)।
স্রাব, অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত ও ক্ষতকর।
ব্যথার সহিত ঘর্ম বা যত ব্যথা তত ঘর্ম (Marc sol, Sipea)।
রক্তস্রাবের প্রবণতা - Lachesis এর নাক, মুখ, মাঢ়ী বা দাঁতের গোড়া প্রভৃতি নানা স্থান হইতে অকারণে সামান্য কারণে প্রচুর রক্তপাত ঘটে। ক্ষত যত সামান্যই হউক না কেন, তাহা হইতেও প্রচুর রক্ত নির্গত হইতে থাকে। ঘর্মও রক্তবর্ণ বা হলুদবর্ণ।
যথাসময়ে ঋতুস্রাব - Lachesis এর স্ত্রীলোকেরা ঠিক নির্দিষ্ট দিনেই ঋতুমতী হন। ঋতুস্রাব বাধাপ্রাপ্ত হইলে অর্শ, নাক দিয়া রক্তস্রাব কিম্বা ব্রহ্মতালুতে জ্বালাবোধ । স্রাবের সহিত রক্তের চাপ (Pulsatilla, Sabina)। Lachesis এর ঋতুস্রাব পরিমাণে বড়ই স্বল্প হয়। স্রাবের সহিত প্রায়ই কোন ব্যথা থাকে না কিন্তু স্রাব দেখা দিবার পূর্বে এবং স্রাব বন্ধ হইলে ব্যথা দেখা যায় । তবে কোন ক্ষেত্রে স্রাবের সহিত পেটব্যথা বা কোমরে ব্যথা দেখা দিতে পারে কিন্তু সাধারণত নির্গমনে নিবৃত্তি হিসাবে স্রাবের সহিত ব্যথার অবসানই স্বাভাবিক। স্রাব ক্ষতকর, থাকিয়া থাকিয়া স্রাব, মাথাব্যথা বা বমি।
ঋতুস্রাব সংক্রান্ত অসুস্থতা - Lachesis এর স্ত্রীলোকেরা ঋতু উদয়কালে বা অন্তকালে প্রায়ই নানাবিধ উপসর্গে কষ্ট পাইতে থাকেন, উন্মাদ হইয়া যান। অনেক সময় তাঁহারা নিজেরাই বলিতে থাকেন যে ঋতু উদয়ের সময় হইতেই বা ঋতু অন্ত যাইবার সময় হইতেই তিনি কষ্ট পাইতেছেন। ঋতুস্রাবের শেষের দিকে Sulphur অথবা Lachesis প্রায়ই ব্যবহৃত হয় এবং দুইটি ঔষধের মধ্যেই ব্রহ্মতালুতে জ্বালাবোধ দেখা দেয়। কিন্তু পূর্বে যে স্পর্শকাতরতা এবং বাচালতার কথা বলিয়াছি তাহা বর্তমান থাকিলে রোগিনী স্থূলকায় হউন বা শীর্ণকায় হউন এবং শরীরের ডানদিক আক্রান্ত হউক বা বামদিক আক্রান্ত হউক, ঋতু অন্তকালীন যাবতীয় রোগে একবার Lachesis এর কথা মনে করিবেন।
গোলা বা ঢেলাবোধ - Lachesis এর গলার মধ্যে, পেটের মধ্যে বা মূত্রাধারের মধ্যে গোলা বা ঢেলার মত কি যেন ঘুরিয়া বেড়ায় কিম্বা আটকাইয়া থাকে। কোষ্ঠকাঠিন্য, মলদ্বারে আসিয়া মল আটকাইয়া থাকে, বেগ থাকে না। উদরাময়, দারুণ দুর্গন্ধ, অসাড়ে মলত্যাগ, অ্যাপেণ্ডিসাইটিস।
মৃগী - অতিরিক্ত শুক্রক্ষয় বা ঈর্ষাজনিত মৃগী, হস্ত মুষ্টিবদ্ধ, মুখে ফেনা। হস্তমৈথুনের প্রবল ইচ্ছা।
সন্ন্যাস; মদ্যপায়ীদের সন্ন্যাস; বামদিকে রোগাক্রমণ। ইরিসিপেলাস, জ্বালা করিতে থাকে ও চুলকাইতে থাকে।
কার্বাঞ্চলের চারিদিকে ছোট ফুস্কুড়ি, দারুণ যন্ত্রণায় উত্তাপে উপশম। ক্ষত বা উদ্ভেদ (ফোড়া) নীলবর্ণ, প্রদাহ নীল, জ্বালায় বৃদ্ধি পায় (Anthracinum, Hepar sulph, Merc sol)। জ্বালা এত ভীষণ যে রোগী রাতে উঠিয়া শীতল জলে স্নান করিতে বাধ্য হয়।
শোথ, প্লীহা ও যকৃত সংক্রান্ত শোথ, গর্ভাবস্থায় পদদ্বয়ে শোথ। প্রস্রাব কালবর্ণ। হার্ট ডিজিজের সহিত শেথ (থ্রম্বোসিস)।
প্রসব-বেদনার সহিত কণ্ঠনালীতে চাপ বোধ, যেন দম বন্ধ হইয়া যাইবে।
দুগ্ধ-বাত বা প্রসবের পর পা ফুলিয়া বেদনাযুক্ত হইয়া ওঠে (Lycopodium)।
যকৃৎ প্রদাহ, যকৃতে ফোড়া, ন্যাবা, নিউমোনিয়া
যক্ষ্মার শেষ অবস্থায় মুখে ঘা, যক্ষ্মার সহিত স্বরভঙ্গ।
একমাত্র গলক্ষত ব্যতীত অন্যান্য সকল যন্ত্রণায় উত্তাপ প্রয়োগ পছন্দ করে। ডিপথিরিয়ায় গরম কিছু খাইতে পারে না। তরল কিছু খাইতেও কষ্টবোধ। কিন্তু সাধারণত মুক্ত বাতাস ভালবাসে। গরম ঘরে বা গরম জলে স্নানে বৃদ্ধি।
বেদনাযুক্ত স্থানে সামান্য স্পর্শ সহা হয় না। কিন্তু সজোরে চাপিয়া ধরিলে উপশম। এইজন্য Lachesis এর রোগী যখন গলার বেদনায় কষ্ট পাইতে থাকে তখন সে শক্ত খাবার অনায়াসে গিলিয়া যায় কিন্তু তরল কিছু খাইতে পারে না। ব্যথা শরীরের পার্শ্ব পরিবর্তন করিতে থাকে (Lac caninum )।
কখনও ক্ষুধা, কখনও অক্ষুধা, দুধ খাইতে চাহে কিন্তু তাহা সহ্য হয় না। রুটি খাইতে অনিচ্ছা। তৃষ্ণা, কিন্তু জলপানের পর বমি। খালি পেটে পেটব্যথা, খাইলে উপশম; শুইয়া পড়িলেও ব্যথা প্রশমিত হয় (Graphitis)। প্লেগ, ইরিসিপেলাস, কার্বাঙ্কল ২৪ ঘন্টার মধ্যে মারাত্মক হইয়া দাঁড়ায় (প্লেগ নামক মহামারী রোগে Lachesis অপেক্ষা Naja অধিক ফলপ্রদ বলিয়া বর্ণিত হয়)। নিদারুণ দুর্বলতা।
হাম, বসন্ত, আঙ্গুলহাড়া, নালী ঘা, শোথ, থ্রম্বোসিস, পাচড়া, ক্যান্সার, গ্যাংগ্রিন, চর্মের উপর ক্ষত, উত্তাপ প্রয়োগে উপশম। কিন্তু গলক্ষতে গরম খাইতে পারে না।
উপদংশ, বাঘী, পারদের অপব্যবহার।
জলাতঙ্ক - Lachesis জলাতঙ্কের একটি মহৌষধ (Belladonna , Cantharis, Stramonium)।
সেপটিক ফিভার, টাইফয়েড, টাইফাস, ম্যালেরিয়া; নিদারুণ দুর্বলতা: শীত প্রকাশ পায় প্রথমে পৃষ্ঠদেশে; মধ্যাহ্নে বৃদ্ধি (Arsenic alb, Sulphur)।
বিকার অবস্থায় বা ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হইয়া সে মনে করে সে মারা গিয়াছে, তাহার সৎকারের ব্যবস্থা হইতেছে, তাহার আত্মা আকাশে উড়িয়া বেড়াইতেছে, তাহাকে হত্যা করিবার ষড়যন্ত্র চলিতেছে, তাহাকে বিষ দেওয়া হইতেছে। সময় সময় সে অশরীরী বাণী শুনিতে থাকে, যেন হত্যা করিবার নির্দেশ দিতেছে, চুরি করিবার নির্দেশ দিতেছে, যেন সে ভগবানের আদেশ পাইয়াছে, যেন তাহার মধ্যে দেবতা আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। ভবিষ্যদ্বাণী করিতে থাকে, শপথ করিতে থাকে, অভিশম্পাত করিতে থাকে, কাঁদিতে থাকে, কামভাব প্রকাশ করিতে থাকে, নির্বাক হইয়া পড়িয়া থাকে, বাড়ি যাইতে চাহে, মৃত্যু স্বপ্ন দেখে। সর্প-ভ্রম, যেন সর্প ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, অনিদ্রা।
শোক-দুঃখজনিত অসুস্থতা, ঈর্ষার কুফল, বসন্তকালে বৃদ্ধি, ১৫ দিন অন্তর বৃদ্ধি, রৌদ্রে বৃদ্ধি, নিদ্রায় বৃদ্ধি। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা বা গরম কোনটাই সহ্য হয় না। অম্ল সহ্য হয় না।
Psorinum, Acid nit এবং Sipea পরে বা পূর্বে ব্যবহৃত হয় না। পুনঃ পুনঃ ব্যবহার করা বা নিম্নশক্তি ব্যবহার করা অত্যন্ত অনিষ্টকর। Belladonna, Tarantulas - Lachesis এর প্রতিষেধক। ক্ষেত্র বিশেষে Lycopodium পরিপূরক।
সদৃশ ঔষধ ও পার্থক্যবিচার
Crotalus horridus
Crotalus horridus ও সাপের বিষ হইতে প্রস্তুত হইয়াছে এবং Lachesis এর মত নিদ্রায় বৃদ্ধি, বসন্তকালে বৃদ্ধি এবং বাচালতা তাহার শ্রেষ্ঠ পরিচয়। কিন্তু ইহাতে রোগ শরীরের ডান দিকেই বেশি প্রকাশ পায় এবং রোগী অতি সত্ত্বর অচেতন বা তন্দ্রাচ্ছন্ন হইয়া পড়ে, ইহাতে দুর্বলতা এতই বেশি। অবশ্য ল্যাকেসিসেও এইরূপ দূর্বলতা আছে এবং Lachesis এর রোগীও তন্দ্রাচ্ছন্ন বা সংজ্ঞাহীন হইয়া পড়ে কিন্তু Lachesis এর রোগগুলি শরীরের বামদিকেই বেশি প্রকাশ পায়। নতুবা Lachesis এর মত ইহাতেও রক্তস্রাবের প্রবণতা খুব বেশি এবং শরীরের যে কোন দ্বার দিয়া কালবর্ণের রক্তস্রাব হইতে থাকে, রক্তস্রাবের সহিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হলুদ বর্ণ হইয়া যায় বা ন্যাবা দেখা দেয়। Crotalus horridus এর এই বৈশিষ্ট্যটি মনে রাখিবেন।
মনে রাখিবেন তাহার দক্ষিণাঙ্গে রোগের আক্রমণ এবং রক্তস্রাবের সহিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হলুদ বর্ণ হইয়া যাওয়া। গর্ভস্রাবের পর অবিরত রক্তস্রাব, প্লেগ, ক্যান্সার, কার্বাঙ্কল, ডিপথিরিয়া বা সেপটিক ফিভার প্রভৃতি সাংঘাতিক রোগাক্রমণে শরীরের যে কোন স্থান হইতে রক্তস্রাব, এমন কি ঘর্মও রক্তাক্ত। স্রাব অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত। দুর্বলতা এত দ্রুত এবং এত সাংঘাতিক যে রোগী অবিলম্বে বা অনতিবিলম্বে তন্দ্রাচ্ছন্নের মত পড়িয়া থাকে বা সংজ্ঞা হারাইয়া ফেলে।
Lachesis এর মত তাহারও জিহ্বা কাঁপিতে থাকে এবং কোমরে কাপড় রাখিতে পারে না। Lachesis এর ই মত সংজ্ঞাশূন্য অবস্থাতেও প্রলাপ বকিতে থাকে। জ্বর খুব প্রবল নহে কিন্তু দুর্বলতা সাংঘাতিক। নাড়ী অত্যন্ত ক্ষীণ বা লোপ পাইয়া যায়। পেট ফুলিয়া ওঠে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাঁপিতে থাকে। প্রদাহযুক্ত স্থান কালবর্ণ হয়। প্লেগ, ডিপথিরিয়া, আমাশয়; সান্নিপাতিক জ্বরের সহিত রক্তস্রাব কালবর্ণের রক্তস্রাবের সহিত ন্যাবা। অতিরিক্ত রক্তস্রাব বা ঘর্মের পর হিমাঙ্গ অবস্থা, শোথ, মদ্যপায়ীদের সন্ন্যাসরোগ, সাংঘাতিক রক্তহীনতা, চিৎ হইয়া শুইলে বা ডান পার্শ্ব চাপিয়া শুইলে সবুজবর্ণের বমি। জিহ্বা উজ্জ্বল লালবর্ণ। এরূপ জিহ্বা ল্যাকেসিসেও দেখা যায় কিন্তু দক্ষিণ পার্শ্বে রোগাক্রমণ এবং দক্ষিণ পার্শ্ব চাপিয়া শুইলে পিত্তবমি ল্যাকেসিসে নাই। মূত্র-স্বল্পতা বা মূত্রাবরোধ। নিদ্রাকালে দাঁতে দাঁতে ঘর্ষণ।
